জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
শনিবার বিকেলে ময়মনসিংহ টাউন হলে জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দলের জাতীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফার ইঙ্গিত করে তিনি একথা বলেন।
ভার্চুয়াল ওই বক্তব্যে তিনি বলেন, স্বৈরাচারী আমলে হামলা-নির্যাতন উপেক্ষা করেও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। এখন পলাতক স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে প্রতিটি মানুষের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ সামনে এসেছে।
তারেক রহমান আরো বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্য নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যেই নির্বাচনের রূপরেখা ঘোষণা করেছে। বিএনপি ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দল, মত, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সবার জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে আসন্ন নির্বাচনে সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৭৬-৭৭ সালের দিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে একাধিকবার মতবিনিময় করেছিলেন। তখন তিনি বিরিশিরি কালচার এ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা, গারো সম্প্রদায়ের জন্য ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন গঠন, রেডিওতে ‘সাল গীতা’ অনুষ্ঠান চালু, ছাত্র হোস্টেল নির্মাণ এবং সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিসহ নানা উদ্যোগ নেন। এতে সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে শহীদ জিয়ার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যার স্মৃতি আজো ময়মনসিংহে বিদ্যমান।
তারেক রহমান বলেন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও কর্মদক্ষতা অর্জনের সুযোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার চর্চা ও প্রয়োগে সক্রিয় থাকা প্রয়োজন। এ কারণেই ২০০৭ সালে বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ আগ্রহে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বিএনপির অস্থায়ী সহযোগী সংগঠন হিসেবে জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু হয়। আজকের প্রতিনিধি সম্মেলন তারই প্রতিফলন।
তিনি আরো বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা ও বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রেখেই তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের সচেতন রাখা নেতৃত্বের অন্যতম দায়িত্ব। পাহাড়ি বা সমতলে বসবাসকারী প্রতিটি জনগোষ্ঠী যদি নিজেদের ও দেশের স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন থাকে, তাহলে কোনো অপশক্তি বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ পাবে না।
তারেক রহমান উল্লেখ করেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৫০টির মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে-সমতল অঞ্চলের ৪২ জেলায় প্রধানত ৩৭টি এবং পাহাড়ি অঞ্চলে আরো কয়েকটি জনগোষ্ঠী। স্বাধীনতার পর সবাইকে ‘বাঙালি’ বানানোর প্রচেষ্টা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মনে অবিশ্বাস তৈরি করেছিল। তবে শহীদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনের মাধ্যমে সেই ক্ষোভ দূর করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি হলো ভাষা, গোত্র, ধর্ম, বর্ণ, মতাদর্শ যার যা-ই হোক না কেন, আমাদের প্রথম পরিচয় আমরা সবাই বাংলাদেশি। সমতল, পাহাড়, শহর, গ্রাম যেখানেই থাকি না কেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ, ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষায় উদ্যোগ, দলীয় কাঠামোয় যোগ্য প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি, সাংস্কৃতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গঠন, প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি এবং নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধা প্রদানের বিষয়ে বিএনপির ইতিবাচক পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া বর্তমানে পাহাড়ি অঞ্চলের তুলনায় বেশি জটিল। এ বিষয়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সহজতর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মৃগেন হাগিদকের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন কিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আরো উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বিজন কান্তি সরকার, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ, মহানগর আহ্বায়ক অধ্যাপক একেএম শফিকুল ইসলাম, উত্তর জেলা আহ্বায়ক অধ্যাপক একেএম এনায়েত উল্লাহ, দক্ষিণ জেলা আহ্বায়ক জাকির হোসেন বাবলু, সদস্য সচিব রোকনুজ্জামান সরকার রোকন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং, আদিবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রমোদ চন্দ্র বর্মনসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
উল্লেখ্য, সম্মেলনে দেশের সমতল অঞ্চলের ১২ জেলার বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রায় এক হাজার প্রতিনিধি অংশ নেন।