দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ১৫০ বছরের পুরোনো বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হবে আজ সোমবার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সফরে এসে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। এজন্য ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এটি হতে যাচ্ছে দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন। একই সঙ্গে মহানগরী হিসেবেও বিবেচিত হবে বলে জানিয়েছেন পৌরসভার কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮২১ সালে বগুড়াকে জেলা ঘোষণার পর শহর উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য ১৮৬৯ সালে বগুড়া টাউন কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক ডব্লিউ ওয়াভেল। ওই কমিটি সাত বছর চলার পর ১৮৭৬ সালের জুলাইয়ে বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলা, সূত্রাপুর ও আশপাশের এলাকা নিয়ে বগুড়া মিউনিসিপ্যালিটি গঠন করা হয়। তখন বগুড়া পৌরসভার আয়তন ছিল ১ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার। প্রথম প্রশাসক ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক জো হোয়াইটম্যান। দীর্ঘ সময় পর ১৯৮১ সালের আগস্টে তৎকালীন সরকার বগুড়া মিউনিসিপ্যালিটির আয়তন বৃদ্ধি করে ১৪ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার করে। একে ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত করে ওয়ার্ডসংখ্যা ৯ থেকে বাড়িয়ে ১২টি করা হয়।
পৌরসভা গঠনের প্রায় ১৫০ বছর পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে ঢাকাসহ দেশের ১১টি পৌরসভা বিভিন্ন সরকারের আমলে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। কিন্তু অবহেলিত ছিল উত্তর জনপদের গেটওয়ে বগুড়া। দেশের সর্ববৃহৎ পৌরসভা হওয়া সত্ত্বেও বগুড়াকে সিটি করপোরেশন করা হয়নি। আয়তন, জনসংখ্যা, নিজস্ব রাজস্ব আয়সহ সিটি করপোরেশনে উন্নীতকরণের সব শর্ত বা যোগ্যতা থাকার পরও সিটি করপোরেশন করা হয়নি। এজন্য বিগত আওয়ামী সরকারের সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করছেন জেলাবাসী।
সবশেষ ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারের আমলে পৌরসভার চারপাশের ৪৮টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত করে বগুড়া পৌরসভার আয়তন ৬৯ দশমিক ৫৬ বর্গকিলোমিটারে উন্নীত করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। সে সময় ১২ ওয়ার্ড থেকে ২১ ওয়ার্ডে উন্নীত হয় বগুড়া পৌরসভা। ২১ ওয়ার্ডে আনুমানিক সাত লাখ লোকের বসবাস।
বগুড়া পৌরসভার তিনবারের নির্বাচিত মেয়র ও বিএনপির সিনিয়র নেতা অ্যাডভোকেট মাহবুবর রহমান বলেন, পৌরসভাকে বৃহৎ আকার দেওয়ার মধ্য দিয়ে পরে বগুড়াকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার পরিকল্পনা ছিল সে সময়। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় বগুড়া পৌরসভা আর সিটি করপোরেশন হয়নি। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে বগুড়াবাসীর পক্ষ থেকে বারবার সিটি করপোরেশনের দাবি জানানো হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে।
গত ১২ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার রংপুর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করে। কিন্তু বগুড়া দেশের সর্ববৃহৎ পৌরসভা হলেও তা পৌরসভাই ছিল। অথচ সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার শর্ত অনেক আগেই পূরণ করেছে বগুড়া। শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বগুড়া সিটি করপোরেশন বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানিয়েছেন বগুড়ার সুশীল সমাজ।
জানা গেছে, জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী সরকারের পতনের পরে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে বগুড়ার তৎকালীন জেলা প্রশাসক হোসনা আফরোজা বগুড়াকে সিটি করপোরেশন করার প্রস্তাব দেন। এরপর এক চিঠিতে বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার জন্য গণবিজ্ঞপ্তি জারি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত ও আপত্তি নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয়।
গত বছরের ২০ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খান পৌরসভার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করে জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিজয় দিবসের আগেই সিটি করপোরেশন ঘোষণা করা হবে। কিন্তু পরে সেটিও হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রটোকল অফিসার-১ উজ্জ্বল হোসেনের বরাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো সফরসূচিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০ এপ্রিল বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী বগুড়া সিটি করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করবেন।
এর আগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব ইমতিয়াজ মোরশেদ স্বাক্ষরিত নোটিসে জানা যায়, বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীতকরণ ও বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা বন্দরকে নতুন উপজেলা ঘোষণাসহ আটটি উন্নয়ন প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রাক-নিকার সচিব কমিটির সভা হয়। সেখানে বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীতকরণের বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়।
বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি ও বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, শহর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট হামিদুল হক চৌধুরী হিরু এবং জেলা যুবদলের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তারেক রহমানের হাত ধরে বগুড়া একটি মডেল সিটি করপোরেশন হবে ।