ভারতের উজানের ঢল ও টানা ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিস্তা নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় উপজেলার তিস্তাতীরবর্তী অন্তত ৪ হাজার ৫০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে তীব্র স্রোতের আঘাতে মহিপুর এলাকায় দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু রক্ষা বাঁধে নতুন করে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিস্তার উজানে পাহাড়ি ঢল ও কয়েক দিনের টানা বর্ষণে উপজেলার কোলকোন্দ, আলমবিদিতর, নোহালী, গঙ্গাচড়া সদর, লক্ষীটারী ও মর্ণেয়া ইউনিয়নের অন্তত বিশাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বাগডোগরা, মিনারবাজার, আনন্দবাজার, বিনবিনা, চর মটুকপুর, চিলাখাল, বাগেরহাট, চর শংকরদহ, কাশিয়াবাড়ী, ইচলি ও চর ছালাপাকসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, রোববার বিকেল থেকে তিস্তার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে এবং রাত ১১টার দিকে তা বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সোমবার ১০টার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
এদিকে গঙ্গাচড়ার মহিপুর এলাকায় দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু রক্ষা বাঁধে নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গত বছর তিস্তার ভাঙনে সেতু রক্ষা বাঁধের ১০০ মিটারের বেশি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে অস্থায়ীভাবে বাঁশের পাইলিং নির্মাণ করা হয়। তবে চলতি বর্ষায় পানি বাড়ার পর তীব্র স্রোতের আঘাতে সেই পাইলিং ভেঙে পড়ে।
এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে মহিপুর দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতু, রংপুর-কাকিনা আঞ্চলিক সড়ক এবং আশপাশের কয়েক হাজার মানুষের বসতবাড়ি হুমকির মুখে পড়েছে।
চর শংকরদহ গ্রামের কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, রাতারাতি পানি বাড়ল, ঘরবাড়ি ডুবে গেল। এখন পানি কিছুটা নামছে, কিন্তু নদীভাঙনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কাল সকালে বাড়ি থাকবে কি না, জানি না।
গৃহবধূ রহিমা বেগম বলেন, তিন দিন ধরে স্কুলে আশ্রয়ে আছি। শিশু ও গবাদি পশু নিয়ে খুব কষ্টে আছি। এখনো কোনো ত্রাণ পাইনি। কোলকোন্দ এলাকার কৃষক সালাম উদ্দিন বলেন, আমনের দেড় একর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। গবাদি পশুর খাদ্য নিয়েও সংকটে আছি।
লক্ষ্মীটারী ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী বলেন, চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে পানিবন্দি মানুষকে দ্রুত সহায়তা এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আর দ্বিতীয় তিস্তা সেতুতে যখন প্রথম ভাঙন শুরু হয়, তখন যদি দুই-এক লাখ টাকার জিও ব্যাগ ফেলা হতো, তাহলে ভাঙন হতো না।
গত বছর থেকেই শুনে আসছি বরাদ্দ আসবে, কিন্তু কোনো বরাদ্দ আসেনি। এখানে বুয়েটের একজন প্রবীণ বিশেষজ্ঞ এসে পরিদর্শন করে বাঁশের পাইলিং স্থাপনের পরামর্শ দেন। কবি নজরুলের বালুর বাঁধ আর বুয়েট ইঞ্জিনিয়ারের বাঁশের পাইলিং দুটোর একই অবস্থা। বালুর বাঁধ যেমন টেকে না, তেমনি বাঁশের বাঁধও প্রথম ধাক্কাতেই ভেঙে গেছে। ১৪ লাখ টাকা ধ্বংস হয়ে গেল।
উপজেলা ত্রাণ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সজিবুল করীম বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে এবং দ্রুত সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হুসেন জানান, প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২০ হেক্টর আমন ধান, ১ হেক্টর মাসকলাই, ২ হেক্টর বীজবাদাম ও ০.৫ হেক্টর সবজির জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে।
জানা গেছে, সেতু রক্ষা বাঁধের ভাঙনের কারণ অনুসন্ধান ও করণীয় নির্ধারণে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ঢাকা থেকে এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসার কথা রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, প্রশাসন বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে।
এদিকে স্থানীয়রা দ্রুত ত্রাণ বিতরণ, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং নদীভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এমএইচ