কুড়িগ্রামে গবাদিপশুর মধ্যে খুরা ও লাম্পি স্কিন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায়, চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খামারি ও গরু পালনকারীরা। গত দুই সপ্তাহে কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর এবং রাজারহাট উপজেলায় খুরা রোগে ১২টি এবং লাম্পিতে আক্রান্ত হয়ে দুটি গরু মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এছাড়াও এ দুই রোগে ইতোমধ্যেই শত শত গরু আক্রান্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন এলাকার খামারি ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ নিশ্চিত করেছেন। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায়, আক্রান্ত এলাকায় মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। খামারি ও গরু পালনকারীদের মাঝে চালাচ্ছেন প্রচারণা।
লাম্পিতে আক্রান্ত গরুর দেহের গুটি বা ফোসকা পটাশ ও হলুদ মিশ্রিত গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করা, মশা-মাছির মাধ্যমে রোগটি ছড়ায়, তাই গোয়ালঘরে মশারি টানানো বা ধোঁয়া দেওয়া এবং তরল খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
আর খুরা রোগে আক্রান্ত গরুর মুখ লবণ বা ফিটকিরি মিশ্রিত পানি দিয়ে পরিষ্কার করা, পায়ের খুরায় পটাশ বা নিমপাতা মিশ্রিত গরম পানি দিয়ে ধুয়ে দেওয়া, ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা এবং নিয়মিত টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে প্রতিবছর কুড়িগ্রামের খামারিরা গরু পালন করে থাকে। সারা বছরের পরিশ্রমে পালন করা গরু ঈদের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে লাম্পি ও খুরা রোগে আক্রান্ত হওয়ায়, তাদের চরম দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের নিষেধাজ্ঞা থাকায়, আক্রান্ত গরু হাটে তোলা যাচ্ছে না। অন্যদিকে চিকিৎসা করে ভালো হওয়া গরুর স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়ায়, সঠিক দাম পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তারা। ফলে এ বছর বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে বলে আশঙ্কা করছেন খামারি ও গরু পালনকারীরা।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে জেলায় এ বছর ১ লাখ ১৬ হাজার গরু এবং ১ লাখ ৮০ হাজার ছাগল-ভেড়া প্রস্তুত করা হয়েছে, যা জেলার চাহিদা পূরণ করে ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রির জন্য সরবরাহ করা হবে।
তবে খুরা ও লাম্পির প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও ঈদের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানান, জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ। এ বিষয়ে তারা বাজারগুলোতে নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন এবং যাতে রোগাক্রান্ত গরু বাজারে না নেওয়া হয়, সে বিষয়েও খামারিদের সচেতন করে দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুড়িগ্রাম সদরের কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের হরিশ্বর ও জোৎগোবর্ধন এলাকায় খুরা রোগে আক্রান্ত হয়ে গত এক সপ্তাহে একটি গর্ভবতী গাভিসহ তিনটি গরু মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পার্শ্ববর্তী এলাকা দাশেরহাটের রায়পুর গ্রামে একটি গাভি লাম্পিতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এছাড়াও ওই এলাকায় অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি গরু খুরা ও লাম্পিতে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, জেলার তিনটি উপজেলায় অন্তত আড়াইশ থেকে তিনশ গরু খুরা রোগে এবং প্রায় ২০০ লাম্পিতে আক্রান্ত হয়েছে। ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায়, সহসাই সংক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না। জেলার অন্যান্য উপজেলাগুলোতেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। সারা বছরই এ রোগ দুটি দেখা দেয়, তবে বর্ষা মৌসুমেই এর বেশি প্রাদুর্ভাব ঘটে।
জেলা সদরের কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের জোৎগোবর্ধন গ্রামের গৃহস্থ আলতাফ হোসেন বলেন, আমার ফ্রিজিয়ান জাতের একটি গাভি খুরা রোগে আক্রান্ত হয়ে গত সপ্তাহে মারা গেছে। গাভিটি গর্ভবতী ছিল। চিকিৎসা করেও কোনো লাভ হয়নি।
আমার অন্তত দেড় লাখ টাকা লোকসান হলো। সদরের বেলগাছা ইউনিয়নের পল্লি প্রাণী চিকিৎসক আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রচুর গরু খুরা ও লাম্পি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, চিকিৎসায় সুস্থও হচ্ছে। তবে ঈদের আগে এই দুই রোগের সংক্রমণ খামারি ও গৃহস্থদের লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে রোগাক্রান্ত গরু বিক্রি করতে পারছে না অপর দিকে সুস্থ হওয়া গরুর স্বাস্থ্যহানি হওয়ায়, দাম কম পাচ্ছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, কুড়িগ্রামের তিনটি উপজেলায় খুরা ও লাম্পি রোগের সংক্রমণের মাত্রা বেশি হলেও অন্য উপজেলাতেও রোগগুলো দেখা যাচ্ছে। আমরা মাঠপর্যায়ে থেকে আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা দিচ্ছি।
তবে কোরবানির হাটে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। এলাকার খামারি ও গরু পালনকারীদের নিষেধ করা হয়েছে, যাতে আক্রান্ত গরু হাটে না নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে আমরাও জেলার হাটবাজারগুলো মনিটরিং করছি।