বাংলার গ্রাম-গঞ্জের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন মসজিদ, যেগুলো কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধারক। তেমনই প্রাচীন এক স্থাপনা কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার চান্দামারী মসজিদ, যা সাড়ে ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে চান্দামারী মণ্ডলপাড়া গ্রামে মসজিদটি অবস্থিত। এলাকার নামেই এর নামকরণ হয়েছে বলে ধারণা স্থানীয়দের। বর্তমানে মসজিদটির পরিচিতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।
মসজিদটি শুধু ধর্মচর্চার কেন্দ্র নয়, বরং ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবেও পরিচিত। সময়ের পরিবর্তনে আশপাশের পরিবেশ, জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এলেও এর স্থাপত্যশৈলী এবং ঐতিহ্য এখনো অটুট রয়েছে। দূর থেকে নজর কাড়ে চুন, ইট ও সুরকি দিয়ে নির্মিত এর সাদা ধবধবে দেয়াল এবং কারিগরদের সূক্ষ্ম কারুকাজ।
প্রাচীনকালে মসজিদের চারপাশে ছিল বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা, খেলার মাঠ, বড় বড় গাছ, ঝোপঝাড় ও জলাশয়। আশপাশের দূরবর্তী গ্রাম থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা এখানে এসে নামাজ আদায় করতেন। মূলত সে সময় মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের সুবিধার্থেই এ মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
তবে কালের বিবর্তনে মসজিদের চারপাশের সেই প্রাকৃতিক পরিবেশ অনেকটাই বদলে গেছে। বড় বড় গাছপালা বিলুপ্ত হয়েছে, পুকুর-জলাশয় ভরাট করে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি ও দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। তবুও মসজিদটি এখনো স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এটি শুধু নামাজের স্থান নয়, বরং এলাকাবাসীর আবেগ, ঐতিহ্য ও স্মৃতিরও অংশ।
স্থানীয় সূত্র ও ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, চুন, ইট ও সুরকি দিয়ে নির্মিত এই মসজিদটির আনুমানিক বয়স সাড়ে ৪০০ বছর। প্রায় ৫১ শতক জমির ওপর নির্মিত মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৫ ফুট এবং প্রস্থ ২২ ফুট। মসজিদের ওপর রয়েছে তিনটি বড় গম্বুজ, যার প্রতিটির ব্যাসার্ধ প্রায় পাঁচ দশমিক ৫০ ফুট। গম্বুজগুলোতে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন নকশা। মসজিদের সামনে পাঁচ ফুট উচ্চতার তিনটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। চার কোণে চারটি মাঝারি আকারের মিনার এবং চারপাশে রয়েছে আরো ১৬টি ছোট গম্বুজ। বাতাস চলাচলের জন্য উত্তর ও দক্ষিণ দিকে একটি করে জানালাও রয়েছে। মসজিদের দেয়ালে খিলান আকৃতির নকশা এবং সামনে একটি বড় পুকুর এর সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
মসজিদটির নির্মাণকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো শিলালিপি না থাকলেও স্থানীয়দের ধারণা, এটি মোগল আমলে নির্মিত। রাজারহাট আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক জাকির হোসেনের সংগ্রহে থাকা ‘ইতিহাস (বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর)’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, আনুমানিক ১৫৮৪ থেকে ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে মসজিদটি নির্মিত হয়। এর স্থাপত্যশৈলীতে সুলতানি আমলের শিল্পরীতি ও মোগল ধাঁচের সমন্বয় স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়।
স্থানীয়দের কেউ কেউ ভারতের বাবরি মসজিদ এবং বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদের সঙ্গে এই মসজিদের স্থাপত্যগত সাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করেন। যদিও গম্বুজের সংখ্যা তুলনামূলক কম, তবুও কারুকাজ ও গাঁথুনির দৃঢ়তায় চান্দামারী মসজিদ তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে।
৮০ বছর বয়সি স্থানীয় বাসিন্দা মেহের আলী জানান, ‘ছোটবেলায় আমি দাদার সঙ্গে এই মসজিদে নামাজ পড়তে আসতাম। দাদার কাছ থেকে শুনেছি, তিনিও তার দাদার সঙ্গে এখানে নামাজ আদায় করতেন। একসময় দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসত। এখন আশপাশে অনেক নতুন মসজিদ তৈরি হলেও অনেকে শখ করে এই ঐতিহাসিক মসজিদেই নামাজ পড়তে আসেন, বিশেষ করে জুমার দিনে।’
৯০ বছর বয়সি আরেক বাসিন্দা লুতফর রহমান বলেন, শুনেছি এ মসজিদ নির্মাণে কোনো রড ব্যবহার করা হয়নি। চুন, ইট ও সুরকি দিয়েই পুরো কাঠামো তৈরি। মসজিদ ঘিরে অনেক অলৌকিক গল্পও প্রচলিত আছে। কয়েক বছর আগে দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করা হলে হাতুড়ির আঘাতে আগুনের ফুলকি বের হলেও দেয়াল ভাঙেনি।
ধর্মীয় দিক থেকেও মসজিদটির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে এখানে বাড়তি প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ করা যায়। তারাবির নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও বিভিন্ন ধর্মীয় আলোচনাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। অতীতে নিয়মিত ধর্মীয় মাহফিলের আয়োজন করা হতো, যেখানে আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে মুসল্লিরা অংশগ্রহণ করতেন। এর ফলে সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন আরো দৃঢ় হয়েছিল।
স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘ইতিহাস গবেষণা চক্র’-এর সদস্য খন্দকার আরিফ জানান, মসজিদটির কোথাও নির্মাণ-সন খোদাই করা নেই। তবে এর স্থাপত্য বিশ্লেষণ করলে মোগল আমলের প্রভাব স্পষ্ট বোঝা যায়। বর্তমানে মসজিদের কিছু অংশে পলেস্তারা খসে পড়েছে। এটি ভেঙে না ফেলে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে কুড়িগ্রামের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে টিকে থাকবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে চান্দামারী মসজিদ আরো দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।