স্বর্ণের কথা উঠলেই প্রথমে মনে আসে গয়নার কথা। হাজার বছর ধরে অলংকার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এই মূল্যবান ধাতু। নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবেও বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের কদর রয়েছে। এ কারণে অনেকে স্বর্ণের বার বা কয়েন কিনে রাখেন।
তবে বিনিয়োগ কিংবা অলংকার তৈরির বাইরেও নানা কাজে স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ স্মার্টফোন থেকে শুরু করে মহাকাশযান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর ব্যবহার রয়েছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, স্বর্ণ খাওয়াও যায়। খাবারে ব্যবহারের এই স্বর্ণ ‘এডিবল গোল্ড’ নামে পরিচিত।
স্বর্ণের এত বহুমুখী ব্যবহারের মূল কারণ এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এটি সহজে ক্ষয় বা মরিচা ধরে না। বিদ্যুৎ পরিবহনেও এটি ভালো। আবার স্বর্ণকে অত্যন্ত পাতলা পাত বা সূক্ষ্ম তারে রূপ দেওয়া যায়।
চলুন, গয়না ও বিনিয়োগের বাইরের স্বর্ণের কিছু ব্যবহার জেনে নেওয়া যাক।
খাবারে স্বর্ণ, কিন্তু কেন?
স্বর্ণ শুধু সাজসজ্জার জন্য ব্যবহৃত হয় না, খাওয়াও হয়। খাবারে ব্যবহারের স্বর্ণ সাধারণত খুব উচ্চমাত্রায় বিশুদ্ধ, প্রায় ২২ থেকে ২৪ ক্যারেট। এটি অত্যন্ত পাতলা করে ব্যবহার করা হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুশি, মিষ্টি, চকলেট, কেক, আইসক্রিমসহ নানা বিশেষ খাবার সাজাতে খাওয়ার উপযোগী স্বর্ণের পাত বা ‘এডিবল গোল্ড লিফ’ ব্যবহার করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাবারে ব্যবহৃত স্বর্ণ ‘ই১৭৫’ নামে অনুমোদিত একটি ফুড অ্যাডিটিভ।
তবে স্বর্ণ খেলে শরীরের বিশেষ কোনো উপকার বা পুষ্টি পাওয়া যায় না। ধাতব স্বর্ণের দ্রাব্যতা খুব কম হওয়ায় মানুষের পরিপাকতন্ত্রে এটি শোষিত হয় না। ফলে খাবারে স্বর্ণ ব্যবহারের উদ্দেশ্য মূলত সাজসজ্জা ও বিলাসিতা, পুষ্টি নয়।
দামি ও বিলাসবহুল হোটেল-রেস্তোঁরায় খাবার ও পানীয়কে আকর্ষণীয় করে তুলতে অতি পাতলা স্বর্ণের পাত, ছোট টুকরা, গুঁড়া বা ক্ষুদ্র পাপড়ির মতো করে স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ এশিয়াতেও মিষ্টি সাজাতে স্বর্ণ বা রুপার পাত ব্যবহারের দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে। সাধারণভাবে একে ‘ভারক’ বা ‘ওয়ার্ক’ বলা হয়।
খাবারে স্বর্ণ ব্যবহারের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ২০২৩ সালে ‘পার্টিকল অ্যান্ড ফাইবার টক্সিকোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত ইঁদুরের ওপর ৯০ দিনের এক গবেষণায় দেখা যায়, ‘ই১৭৫’ খাওয়ানোর পর তাদের লিভার, প্লীহা বা অন্ত্রে সরাসরি কোনো ক্ষতি পাওয়া যায়নি। তবে অন্ত্রে থাকা জীবাণুর পরিমাণ ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে।
গবেষণায় আরো দেখা যায়, মানুষ সাধারণত যতটা স্বর্ণ খায়, তার চেয়ে বেশি পরিমাণে স্বর্ণ খাওয়ানো স্ত্রী ইঁদুরের অন্ত্রে হালকা প্রদাহ দেখা গেছে।
মোবাইল, কম্পিউটারসহ নানা যন্ত্রে স্বর্ণ
আমাদের হাতে থাকা স্মার্টফোনের ভেতরেও স্বর্ণ থাকে, যদিও পরিমাণ খুবই সামান্য। কম্পিউটার, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের সার্কিট বোর্ড, কানেক্টর, সুইচ ও অন্যান্য সংযোগস্থলেও স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়।
এর কারণ, স্বর্ণের মধ্য দিয়ে সহজেই বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে এবং এটি সহজে ক্ষয় বা মরিচা ধরে না। ফলে দীর্ঘদিন বৈদ্যুতিক সংযোগ সচল রাখতে স্বর্ণ কার্যকর।
কম্পিউটার, যোগাযোগের সরঞ্জামসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যে তাই স্বর্ণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি যন্ত্রে খুব অল্প পরিমাণ স্বর্ণ থাকলেও বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরি হয়। সব মিলিয়ে এ খাতে স্বর্ণের ব্যবহারও কম নয়।
এ কারণেই পুরোনো ফোন, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে স্বর্ণ সংগ্রহ করে পুনরায় ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।
মহাকাশেও কেন প্রয়োজন স্বর্ণ?
মহাকাশ প্রযুক্তিতেও নানা কাজে স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণ আলো ও তাপ বিকিরণ খুব ভালোভাবে প্রতিফলিত করতে পারে। দীর্ঘ সময়েও এর উজ্জ্বলতা সহজে নষ্ট হয় না।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের আয়নাগুলোতে স্বর্ণের খুব পাতলা প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইনফ্রারেড আলো প্রতিফলনে স্বর্ণ বেশ কার্যকর। এই ইনফ্রারেড আলো শনাক্ত করেই জেমস ওয়েব মহাবিশ্বের নক্ষত্র, ছায়াপথসহ দূরবর্তী বিভিন্ন বস্তু পর্যবেক্ষণ করে।
মহাকাশচারীদের হেলমেটেও স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়। নাসার তথ্য অনুযায়ী, হেলমেটের সামনে চোখ-মুখ ঢেকে রাখা স্বচ্ছ অংশে স্বর্ণের পাতলা প্রলেপ থাকে। এটি অনেকটা সানগ্লাসের মতো কাজ করে এবং সূর্যের তীব্র ও ক্ষতিকর রশ্মি থেকে মহাকাশচারীদের সুরক্ষা দেয়।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ পরিবহনের ক্ষমতা এবং সহজে ক্ষয় না হওয়ার কারণে মহাকাশযানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও বৈদ্যুতিক সংযোগেও স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়।
রোগ শনাক্ত থেকে চিকিৎসায় স্বর্ণের ব্যবহার
চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বর্ণের ব্যবহার নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ‘গোল্ড সল্ট’ নামে পরিচিত স্বর্ণের কিছু যৌগ একসময় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে আরও কার্যকর ওষুধ চলে আসায় এ ক্ষেত্রে স্বর্ণের ব্যবহার অনেক কমেছে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবশ্য নতুনভাবে স্বর্ণের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, অতি ক্ষুদ্র ‘গোল্ড ন্যানোপার্টিকল’ ব্যবহার করে রোগ শনাক্ত করা, শরীরের নির্দিষ্ট জায়গায় ওষুধ পৌঁছে দেওয়া এবং ক্যান্সার শনাক্ত ও চিকিৎসায় কীভাবে স্বর্ণকে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
তবে এসব ব্যবহারের অনেকটাই এখনো গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে।
রোগ নির্ণয়ের কিছু পরীক্ষাতেও স্বর্ণের ন্যানোপার্টিকল ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে কিছু দ্রুত পরীক্ষার কিটে ফলাফল বোঝাতে যে রঙিন রেখা দেখা যায়, তা তৈরিতে এসব কণা কাজে লাগে।
দাঁতের চিকিৎসায় অবশ্য স্বর্ণের ব্যবহার আরও পুরোনো। আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সহজে ক্ষয় না হওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় দাঁত মেরামত বা পুনর্গঠনের কাজে স্বর্ণ ও স্বর্ণের সংকর ধাতু ব্যবহার করা হয়।
তবে স্বর্ণের দাম বেশি হওয়া এবং বিকল্প উপকরণ সহজলভ্য হওয়ায় বর্তমানে দাঁতের চিকিৎসায় এর ব্যবহার আগের তুলনায় কমেছে।
রিজার্ভে হাজার হাজার টন স্বর্ণ কেন?
বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলার ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি রিজার্ভ হিসেবে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণও জমা রাখে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস।
একসময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভের বড় অংশই স্বর্ণ দিয়ে গঠিত হতো। এমনকি একটি দেশের মুদ্রার মূল্যও তার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা স্বর্ণের মজুতের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
বর্তমানেও অনেক দেশ তাদের বিদেশি সম্পদের একটি অংশ স্বর্ণ হিসেবে ধরে রাখে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। দেশটির মজুতে রয়েছে ৮ হাজার ১৩৩ টন স্বর্ণ, যা ৮১ লাখ কিলোগ্রামেরও বেশি।
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে সব মিলিয়ে প্রায় ১৬ হাজার ৪০০ টন স্বর্ণ ছিল। এসব দেশের বৈদেশিক রিজার্ভের ৭০ শতাংশেরও বেশি স্বর্ণ দিয়ে গঠিত।
তবে স্বর্ণ কেনার দৌড়ে বর্তমানে চীন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের রিজার্ভের অন্যান্য সম্পদ থেকে স্বর্ণের ভাণ্ডারে স্থানান্তর করছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে চীনের ২ হাজার ২৭৯ টন স্বর্ণের রিজার্ভ ছিল। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে চীন আরও প্রায় ১৯ টন স্বর্ণ কিনেছে। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো স্বর্ণ কেনেনি। এর আগে, ২০২৩ সালেও চীন প্রায় ৮৮ টন স্বর্ণ কিনেছিল।
এএম