দেশের পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটানো, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ সহায়তা চায় রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। ১০ বছর মেয়াদে (দুবছর গ্রেস পিরিয়ডসহ) এই ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে আইসিবি। সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি পুঁজিবাজারের উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের প্রসার এবং শেয়ারবাজারে মূলধন প্রবাহ বৃদ্ধিতে ‘মার্কেট মেকার’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি মন্দা, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট এবং উচ্চ সুদহারের কারণে বাজারে পতন দেখা দিয়েছে। এছাড়া বিগত বছরগুলোতে উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ এবং বিদেশি মুদ্রার ঋণ পরিশোধের কারণে আইসিবির ওপর আর্থিক চাপ বেড়ে গেছে। বর্তমানে নিয়মিত শেয়ার কেনাবেচা বা ক্যাপিটাল গেইন না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব আয়ও দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আইসিবির পক্ষ থেকে পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এ ১০ হাজার কোটি টাকা পাওয়া গেলে তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিভিন্ন কৌশলগত খাতে ব্যবহার করা হবে। এই তহবিলের একটি বড় অংশ সরাসরি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হবে, যা বাজারে তারল্য সংকট দূর করতে এবং শেয়ারের গতিশীলতা ফেরাতে সহায়তা করবে। উচ্চ সুদের আগের ঋণগুলো পরিশোধের মাধ্যমে আইসিবির আর্থিক ব্যয় বা সুদজনিত চাপ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। পর্যায়ক্রমে এই তহবিল ব্যবহারের মাধ্যমে আইসিবিকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও লাভজনক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যাবে, যা নিয়মিতভাবে সরকারকে লভ্যাংশ প্রদানে সক্ষম হবে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ভয়াবহ ধসের পর বাজার পুনর্গঠন, তারল্য সংকট দূরীকরণ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আইসিবি ‘মার্কেট মেকার’ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে ২০১০ সালের ধসের পর বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং তারল্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী উচ্চ সুদে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে মেয়াদি আমানত সংগ্রহ করে আইসিবি ধারাবাহিকভাবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছে।
চিঠিতে আরো জানানো হয়েছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে অদ্যাবধি সরকার আইসিবিকে মোট ২৯৮.২৬ কোটি টাকা মূলধন প্রদান করেছে। এর বিপরীতে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত আইসিবি সরকারি কোষাগারে লভ্যাংশ ও করপোরেট ট্যাক্স বাবদ মোট ১,৭৮৫.০৬ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। এর মধ্যে লভ্যাংশ বাবদ ৫৯২.৯৪ কোটি টাকা এবং করপোরেট ট্যাক্স বাবদ প্রায় ১,১৯২.১২ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে একটি রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিবি ধারাবাহিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ অবদান রেখে আসছে।
চিঠিতে তুলে ধরা হয়, পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে গিয়ে একসময়ের আর্থিকভাবে শক্তিশালী আইসিবি বর্তমানে বেশ দুর্বল ও উচ্চ দায়গ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ফলে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে বাজারকে সার্বিক সহায়তা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটির জন্য অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।
এ সংকট উত্তরণে এবং পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকার কর্তৃক স্বল্পব্যয়ী তহবিল বা ঋণ সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী ১০ বছর মেয়াদে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ সহায়তা পেলে আইসিবি তার আর্থিক ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। এই তহবিলের সঠিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাত হাজার কোটি টাকা উচ্চ সুদবাহী দায় পরিশোধের মাধ্যমে বড় অঙ্কের ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। আর বাকি তিন হাজার কোটি টাকা পুনরায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে মূলধনী ও লভ্যাংশ আয় অর্জন করে মাত্র দুবছরের মধ্যে আইসিবিকে পুনরায় একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যাবে।
আইসিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, শেয়ারবাজারকে বাঁচাতে গিয়ে এক সময় বেশি দামে শেয়ার কিনে এখন বড় লোকসানে আছে আইসিবি। এ ছাড়া অতীতে অনেকে আইসিবিকে শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাতে প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে। এ অবস্থায় এটিকে টিকিয়ে রাখতে ১০ হাজার কোটি টাকার স্বল্প সুদের ঋণ দরকার।