নতুন আমদানি নীতিতে নিট ফেব্রিক আমদানির সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ার বিধান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্পের শীর্ষ দুই সংগঠন। রপ্তানিমুখী কারখানার উৎপাদন সচল রাখা, বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে এ শর্ত অবিলম্বে স্থগিত বা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে পাঠানো পৃথক চিঠিতে সংগঠন দুটি এ দাবি জানায়। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম শনিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় দুই সংগঠন।
গত ২৪ আগস্ট প্রকাশিত ‘আমদানি নীতি ২০২৬-২০২৯’-এর ২৫ ধারায় শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণ আমদানির শর্তাবলির উপধারা-১২-তে বলা হয়েছে, ‘নিট ফেব্রিকস আমদানি যোগ্য হবে না’। এ বিধান নিয়েই আপত্তি জানিয়েছে পোশাক খাতের সংগঠন দুটি।
বিকেএমইএ জানিয়েছে, নীতিটি চূড়ান্ত হওয়ার আগে অংশীজনদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সংশ্লিষ্ট শর্তটি ভুলক্রমে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তখন সেটি সংশোধনের আশ্বাসও দেওয়া হয়। কিন্তু চূড়ান্ত নথিতে বিধানটি বহাল থাকায় হতাশ হয়েছে সংগঠনটি।
সংগঠনটির ভাষ্য, রপ্তানি আদেশ পূরণে ক্রেতাদের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশীয় ও বিদেশি—দুই উৎস থেকেই প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়। বিশেষ করে নির্দিষ্ট মান, নকশা, রং ও বৈশিষ্ট্যের কাপড় অনেক সময় স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায় না। তখন বিদেশি সরবরাহকারীর কাছ থেকে তা সংগ্রহ করা ছাড়া বিকল্প থাকে না।
এ ছাড়া দেশের তীব্র গ্যাসসংকটের কারণে নিটওয়্যার শিল্পের পাশাপাশি ফেব্রিক উৎপাদনকারী অনেক প্রতিষ্ঠানও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মুখে রয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করলে সময়মতো রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাণিজ্যমন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাদের নির্ধারিত মান, নকশা ও পণ্যের বৈচিত্র্য বজায় রাখার পাশাপাশি দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে নির্দিষ্ট ধরনের ফেব্রিক সংগ্রহ করতে হয়। আমদানির সুযোগ সীমিত হলে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজিএমইএর মতে, প্রয়োজনীয় ফেব্রিক বিদেশি ক্রেতার মনোনীত সরবরাহকারীর কাছ থেকে আনার সুযোগ না থাকলে উৎপাদন পরিকল্পনায় জটিলতা তৈরি হবে। এতে নির্ধারিত লিড টাইমের মধ্যে পণ্য তৈরি ও জাহাজীকরণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সময়মতো মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প দেশ থেকে পোশাক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি আদেশ ও বৈদেশিক বাজারের অবস্থানের ওপর।
অন্যদিকে, নতুন নীতির প্রভাব ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছানো চালানের ওপরও পড়ছে বলে জানিয়েছে বিকেএমইএ। সংগঠনটির দাবি, আগে খোলা ঋণপত্রের (এলসি) ভিত্তিতে আমদানি করা বিভিন্ন ধরনের নিট ফেব্রিকের চালান চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে। অনেক রপ্তানিকারকের আমদানি প্রক্রিয়াও এখনো চলমান। নতুন বিধানের কারণে এসব পণ্য খালাসে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
এতে একদিকে বন্দরে আমদানি করা কাঁচামাল আটকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট রপ্তানি আদেশ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আগে খোলা এলসির আওতায় আনা পণ্যের ক্ষেত্রে নতুন বিধান প্রয়োগ হলে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছে সংগঠনটি।
পোশাক খাতের দুই সংগঠন বলছে, বাংলাদেশের নিট পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করছে বিভিন্ন দেশের উৎপাদনকারীদের সঙ্গে। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরি এবং দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহের নমনীয়তা থাকা জরুরি। এ সুযোগ সংকুচিত হলে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি নতুন আদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ অবস্থায় শতভাগ রপ্তানিমুখী নিট পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে ‘নিট ফেব্রিকস আমদানি যোগ্য হবে না’—আমদানি নীতির এ শর্ত দ্রুত স্থগিত অথবা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের জোরালো দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। একই সঙ্গে আগে খোলা এলসির আওতায় আমদানি করা ফেব্রিক খালাসের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা না রাখারও অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠন দুটি।