হোম > বাণিজ্য

রমজানের আগে নিত্যপণ্যের আমদানি ও এলসি বেড়েছে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার আশা

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

আসন্ন পবিত্র মাহে রমজানকে সামনে রেখে ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, ছোলা ও খেজুরের আমদানি এবং ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ বেড়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ এসব নিত্যপণ্যের আমদানি বাড়ায় রমজানে বাড়তি চাহিদা মোকাবিলায় সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারে ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও মসুর ডালের দাম কিছুটা কমেছে এবং ভোজ্যতেল ও চিনির দাম স্থিতিশীল রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় ও শুল্ক কাঠামোর বিষয়গুলো নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ভোজ্যতেল, ডিম, ডাল, ছোলা, খেজুর ও চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সার্বিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্তে এসব চিত্র উঠে আসে। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। আসন্ন রমজানে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা, মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং আমদানি ও শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের বিভিন্ন দিক নিয়ে সভায় আলোচনা হয়।

নিত্যপণ্যের আমদানি ও এলসিতে অগ্রগতি

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল ও খেজুরের আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে।

এ সময়ে মোট ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার মেট্রিক টন, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের (৭ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন) তুলনায় ১ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন বেশি। ভোজ্যতেলের এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টনে, যা আগের বছরের চেয়ে ১ লাখ ৩১ হাজার মেট্রিক টন বেশি। এছাড়া সয়াবিন বীজ আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ১ হাজার মেট্রিক টন, যা গত বছরের তুলনায় ১ লাখ ১৩ হাজার মেট্রিক টন বেশি।

চিনি আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৫৩ হাজার মেট্রিক টন বেশি। চিনির এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টনে।

রমজানে ইফতারের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ছোলার আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ছোলা আমদানি হয়েছে ৮২ হাজার মেট্রিক টন, যেখানে গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১২ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৭০ হাজার মেট্রিক টন। এ সময়ে ছোলার এলসি খোলা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টন।

অন্যদিকে, মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন, যা গত বছরের চেয়ে ৬৪ হাজার মেট্রিক টন বেশি। মসুর ডালের এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টনে। খেজুর আমদানি হয়েছে ১১ হাজার মেট্রিক টন, যেখানে গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার মেট্রিক টন।

স্থানীয় বাজারে কমেছে ডিম, মুরগি ও ডালের দাম

ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে খুচরা পর্যায়ে ডিমের দাম ৭ দশমিক ৬২ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪৭ থেকে ৫০ টাকায়। একই সময়ে ব্রয়লার মুরগির দাম ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় নেমেছে।

বড় দানার মসুর ডালের দাম গত এক মাসে ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি বড় দানার মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। মাঝারি দানার মসুর ডালের দামও গত বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ কমেছে।

বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ২০৪ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতল ১ হাজার টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। চিনির দাম প্রতি কেজি ১১০ থেকে ১১৫ টাকার মধ্যে অপরিবর্তিত আছে। সাধারণ মানের খেজুর মানভেদে প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত এক মাস ধরে স্থিতিশীল।

রমজানে ডিম-মুরগির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার প্রত্যাশা

সভায় পোলট্রি খাতের প্রতিনিধিরা জানান, বর্তমানে ডিম ও মুরগির উৎপাদন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। খামার পর্যায়ে ডিমের দাম কিছুদিন আগের প্রতি পিস সাড়ে ১১ টাকা থেকে কমে ১০ টাকার নিচে নেমেছে, যা উৎপাদন খরচের কাছাকাছি। খামারে রোগবালাইয়ের বড় কোনো প্রকোপ না থাকায় উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা নেই বলে জানান তাঁরা।

প্রতিনিধিদের মতে, রমজানে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের কারণে ডিমের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। তবে ঈদের পর মুরগির চাহিদা বাড়লে তা বাজারদরে প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁরা আরও জানান, বিদ্যমান আমদানি নীতি অনুযায়ী সরকারের বিশেষ অনুমতি ছাড়া ডিম ও মাংস আমদানি করা যায় না।

খেজুরের শুল্ক কাঠামো সহজ করার উদ্যোগ

সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা খেজুরের জাত, গুণগত মান ও মূল্যের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে শুল্ক কাঠামো সহজ, স্বচ্ছ ও যৌক্তিক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন, মিসর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ প্রায় এক ডজন দেশ থেকে বিভিন্ন মানের খেজুর আমদানি করা হয়। পণ্যের এই বৈচিত্র্যের কারণে একক বা ঢালাও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই আমদানিকারকদের জন্য সহজবোধ্য ও বাস্তবসম্মত শুল্কব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। শুল্ক নির্ধারণের বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন হলেও কার্যকর সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে নিবিড় সমন্বয় জরুরি।

আলোচনায় খেজুরের প্রচলিত শুল্ক সুবিধা দ্রুত কার্যকর করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ সুবিধা বাস্তবায়নের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি খেজুরের নির্দিষ্ট মূল্য ধরে শুল্কায়নের পরিবর্তে প্রকৃত গুণগত মান ও মূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের প্রস্তাব আলোচনায় আসে।

আমদানিকারকেরা জানান, সাধারণ মানের খেজুরের ক্ষেত্রে প্রকৃত আমদানি মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শুল্কায়ন না হলে আমদানি ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যায়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিকল্প নৌপথ ব্যবহার, বর্ধিত লজিস্টিক ব্যয় এবং এলসি খোলার জটিলতা যুক্ত হয়ে বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি করে। ফল আমদানিকারকেরাও উচ্চ করহারের কারণে সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে কর কাঠামো আরও সহনশীল করার দাবি জানান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেয়।

আন্তর্জাতিক বাজার ও শুল্ক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ

ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের পর্যালোচনায় বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও ছোলার দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও মসুর ডালের দাম কমেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি, আমদানি ব্যয় এবং স্থানীয় সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা প্রয়োজন।

সভায় আরও উল্লেখ করা হয়, ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে বর্তমানে কোনো শুল্ক-কর নেই। তবে চিনি ও ফল আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা করে যৌক্তিক সমন্বয় করা গেলে বাজারে দাম সহনীয় রাখা সম্ভব হবে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় বাজারে তাজা ফলের দামও কিছুটা কমেছে বলে পর্যালোচনায় উঠে আসে।

সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা এবং জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সার্বিকভাবে নিত্যপণ্যের আমদানি ও এলসি খোলার ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাজারে দরপতনের ধারা আসন্ন রমজানে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রমজানের আগে নিত্যপণ্যের আমদানি ও এলসি বেড়েছে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার আশা

আয়কর রিটার্ন না দিলে যে ৫ বিপদে পড়তে পারেন

রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকে নতুন এমডি, বেসরকারি ব্যাংক থেকে দুজন

দোহায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরল ইনভেস্ট বাংলাদেশ

মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ আলোচনায় রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে নজর

খেলাপি সিটি গ্রুপকে নতুন ঋণ দিতে আইনি ছাড় চায় ব্যাংকগুলো

কবে হবে এফবিসিসিআই নির্বাচন

প্রথম প্রান্তিকে এডিপি বাস্তবায়নের হার রেকর্ড সর্বনিম্ন ৩.৮৯ শতাংশ

বিদেশি পর্যটকদের কার্ড পেমেন্টের ১৫% বৈদেশিক মুদ্রা রাখতে পারবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান

একনেক বৈঠক স্থগিত, আটকে গেল ১৫ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন