বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্য ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিষয়ক আলোচনা সভা হয়েছে। শনিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর বিজিএমইএ কমপ্লেক্সের নুরুল কাদের অডিটরিয়ামে এ সভা হয়। এ সময় পোশাক খাতের শ্রমিকদের দ্রুত সময়ের মধ্যে পেনশন স্কিমে অর্তর্ভুক্ত করার তাগিদ দেন বক্তারা। পাশাপাশি পেনশন স্কিমটি শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন তারা।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের অধীন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য শেখ কামরুল হাসান, বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান ও সহসভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান।
স্বাগত বক্তব্যে শেখ কামরুল হাসান বলেন, দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বৃদ্ধ বয়সে যে আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না বিধায় উন্নত দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও বৃদ্ধ বয়সে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই সরকার সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছে।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন ড. মো. সুরাতুজ্জামান। তিনি বলেন, দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সরকার সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করেছে, যা বার্ধক্যে নাগরিকদের আর্থিক সুরক্ষার একটি বড় অবলম্বন হয়ে উঠবে। স্কিমে জমা দেওয়া অর্থ গ্রাহকদেরই যথাসময়ে ফেরত দেওয়া হবে এবং ষাটোর্ধ্ব বয়সে উন্নত জীবন ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। তিনি বলেন, পেনশন স্কিমের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও শক্তিশালী করার জন্য সরকার এডিবির অর্থায়নে ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তা ছাড়া, বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০২৬-এর সর্বশেষ সংশোধনীতে ১০০ জনের বেশি শ্রমিক আছে এমন সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
পোশাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের এই স্কিমে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য বিজিএমইকে অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজনকে সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমান সরকার সর্বজনীন পেনশন স্কমের গুরুত্ব উপলব্ধি করে নির্বাচনি ইশতেহার ২০২৬ এ পেনশন তহবিল গঠনের কথা বলেছেন, যেটি বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার কাজ করছেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের সার্বিক কল্যাণ, সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর। সে ক্ষেত্রে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে পোশাক খাতের সব শ্রমিককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যা সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় এক ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও বলেন, এই স্কিমকে শ্রমিকদের মাঝে অধিকতর জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় করতে প্রথম ২ বছরের জন্য বিশেষ সরকারি প্রণোদনা প্রদান এবং পোশাক শ্রমিকদের ক্ষেত্রে পেনশনের বয়সসীমা ৬০ বছরের পরিবর্তে ৫৫ বছর নির্ধারণ করা যেতে পারে। এই সংস্কারসমূহ বাস্তবায়িত হলে শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্কিমে যুক্ত হতে আরও বেশি আগ্রহী হবেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিককে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং পরবর্তীতে এর ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে চ্যালেঞ্জ থাকলেও সরকারের এই স্কিম চালুর উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী, যুগান্তকারী এবং প্রশংসনীয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আকর্ষণীয় মুনাফার হার বিবেচনা করলে এটি আমাদের শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখবে। তাই পোশাক খাতের সব শ্রমিককে এই যুগান্তকারী স্কিমের আওতায় নিয়ে আসতে বিজিএমইএ সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করবে।
সভায় উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা স্কিম নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও সংশয় তুলে ধরলে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান বিস্তারিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাদের আশ্বস্ত করেন। বক্তারা বলেন, দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সুসংগঠিত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্যেই সরকারের এই কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, এবং পোশাক খাতের মতো বৃহৎ কর্মসংস্থানমুখী খাতের সম্পৃক্ততা এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
অনুষ্ঠানে বিজিএমইএর সদস্য, বিভিন্ন পোশাকশিল্পের মালিক, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, শ্রমিক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।