হোম > বাণিজ্য

‘ব্লু-চিপস’ থেকে ‘জাংক’ ক্যাটাগরিতে সিঙ্গার

কাওসার আলম

বড় ধরনের মুনাফা অর্জন ও বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণীয় লভ্যাংশ দেওয়ার কারণে দেশের শেয়ারবাজারে ‘ব্লু-চিপস’ কোম্পানি হিসেবে খ্যাত সিঙ্গার বাংলাদেশ এখন ‘জাংক’ কোম্পানির শেয়ারে পরিণত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ লোকসানের কারণে লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি পুঞ্জীভূত আয় ঋণাত্মক হওয়ার কারণে গত ৮ জুলাই ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমন ঘটেছে বহুজাতিক এ কোম্পানিটির।

দেশের শেয়ারবাজারে বহুজাতিক কোম্পানির ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে যাওয়ার উদাহরণ খুব একটা নেই বললেই চলে। ‘জেড’ ক্যাটাগরি কোম্পানিকে ‘জাংক’ কোম্পানির শেয়ার হিসেবে বিনিয়োগের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জানা গেছে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত উচ্চ মুনাফা অর্জনকারী সুপরিচিত বহুজাতিক কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশ ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো লোকসানে পড়ে। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২৫ কোটি টাকায়, যা ২০২৩ সালের ৫২ কোটি টাকা নিট মুনাফার তুলনায় সাড়ে চারগুণের বেশি। ফলে কোম্পানির পুঞ্জীভূত আয় ঋণাত্মক হওয়ায় লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ। আর্থিক এই বিপর্যয়ের কারণে কোম্পানিটির শেয়ার ‘এ’ থেকে সরাসরি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমিত হয়েছে এবং শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২২ টাকা ৫৬ পয়সা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উৎপাদন বা বিক্রি কমে যাওয়ায় নয়, বরং কৌশলগত রূপান্তর এবং ঋণের অতিরিক্ত বোঝার কারণেই লোকসানি কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে তুর্কি কনগ্লোমারেট ‘কচ হোল্ডিং’-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘আর্চেলিক’ ডাচ কোম্পানির কাছ থেকে ৫৭ শতাংশ শেয়ার কিনে সিঙ্গার বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর কোম্পানিটি আমদানি নির্ভর ‘অ্যাসেট-লাইট’ মডেল থেকে সরে এসে মূলধন-নিবিড় ‘স্থানীয় উৎপাদনকারী’ মডেলে রূপান্তর ঘটে। এই কৌশলের অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জের স্পেশাল ইকোনমিক জোনে ৩৪ একর জমিতে প্রায় ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নতুন ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট স্থাপন করা হয়।

জানা গেছে, কারখানাটির অর্থায়নে নিজস্ব তহবিলের পরিবর্তে ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে সিঙ্গার। ২০২৪ সালের মার্চে মূল প্রতিষ্ঠান আর্চেলিক থেকে সাড়ে ২৭ মিলিয়ন ইউরো এবং স্থানীয় ব্যাংক সিন্ডিকেট থেকে ২৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। ইউরোর বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার কোম্পানিটিকে তীব্র আর্থিক সংকটে ফেলে। এর প্রভাবে ২০২৩ সালে ৬০ কোটি ৪০ লাখ টাকার সুদজনিত ব্যয় ২০২৫ সালে বেড়ে ৩২২ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের কারণেও বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়।

একই সময়ে গুলশানে নতুন করপোরেট অফিস স্থানান্তর, শোরুমের লিজ রেন্টাল এবং প্রধান কার্যালয়কে রয়্যালটি ও টেকনিক্যাল ফি পরিশোধের ফলে পরিচালন ব্যয়ও ৩৬০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৪৮০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এছাড়া অস্বাভাবিকভাবে মজুত পণ্যের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া—যা ২০২৩ সালে ৫২৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৯৫৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে—কোম্পানির চলতি মূলধন আটকে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সার্বিক এই ঋণভারে জর্জরিত হয়ে বহুজাতিক এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

জানা গেছে, গ্রাহক ও ডিলারদের বকেয়া পাওনা ২০২৩ সালের ৩৬৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৪৮৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়। বকেয়া আদায় শ্লথ হওয়ায় ঋণ অবলোপন ও সংশয়জনক দেনা সঞ্চিতি বৃদ্ধি পায়। এছাড়া উচ্চমূল্যস্ফীতির বাজারে প্রতিযোগিতা রক্ষা করতে গিয়ে ছাড় ও বিশেষ অফার দেওয়ায় কোম্পানির গ্রস প্রফিট মার্জিন ২৮.৮ শতাংশ থেকে কমে ২৪.২ শতাংশে নেমে আসে।

এদিকে লোকসান কাটিয়ে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটি পুনরায় মুনাফায় ফিরেছে বলে আমার দেশকে জানিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিচালন ব্যয় কমানো, নারায়ণগঞ্জের গ্রিন ফ্যাক্টরি চালুর পর সাময়িকভাবে মূলধনী ব্যয় স্থগিত করা এবং ঋণ কমানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

কোম্পানির পক্ষ থেকে আরো বলা হয়েছে, সিঙ্গার ও বৈশ্বিক বেকো পোর্টফোলিও একীভূত করে যৌথ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে বাজারের অংশীদারত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন কেন্দ্র থেকে রপ্তানি শুরু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তার পরিমাণ আরো বাড়বে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যের দাম সাশ্রয়ী রাখতে কর্তৃপক্ষ কাজ করছে এবং আগামীতে এসব উদ্যোগের সুফল মিলবে বলে আশা করছে কোম্পানিটি।

আর্চেলিক গ্রুপ তাদের মূল আন্তর্জাতিক অ্যাপ্লায়েন্স ব্র্যান্ড ‘বেকো’ পণ্যগুলো এখন সিঙ্গার বাংলাদেশের মাধ্যমে দেশের বাজারে নিয়ে এসেছে। এর ফলে সিঙ্গার তাদের নিজস্ব শোরুম ও প্ল্যাটফর্মে ‘সিঙ্গার’-এর পাশাপাশি ‘বেকো’ ব্র্যান্ডের ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিনসহ বিভিন্ন হোম অ্যাপ্লায়েন্স আলাদা বা যৌথ প্রমোশনে বিক্রি করছে।

সিঙ্গার বাংলাদেশের একসময়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবু মো. হামিম রাহমাতুল্লাহর সঙ্গে সিঙ্গার কোম্পানির বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু, ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয় হওয়াসহ নানা বিষয়ে আমার দেশের সঙ্গে কথা হয়। আলাপচারিতায় তিনি আমার দেশকে বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সেলাই মেশিন দিয়েই বাংলাদেশে সিঙ্গার কোম্পানি একটি ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে ওঠে। এরপর ১৯৮৫ সালে পণ্যবহুমুখীকরণের উদ্যোগ নেয়। ধীরে ধীরে যুক্ত হয় টিভি, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, রাইস কুকার ইত্যাদি ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালি পণ্য। গুণগত মান ও এক্সক্লুসিভ ডিজাইনের কারণে সিঙ্গারের পণ্যগুলো ক্রেতাদের আস্থার শীর্ষে পৌঁছে।

তিনি আরো বলেন, খ্যাতির শীর্ষে উঠে আসার পেছনে প্রত্যেক কোম্পানির নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। সিঙ্গারেরও তেমনই কিছু ব্যবসায়িক বৈশিষ্ট্য বা সংস্কৃতি রয়েছে। সিঙ্গার সব সময় ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করত এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এটিই ছিল প্রধান নিয়ামক। সিঙ্গারের পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে নিজস্ব শোরুমের পাশাপাশি ডিলার প্রথা চালু করে। এর মাধ্যমে সিঙ্গারের ক্রেতার সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়ে যায় এবং গৃহস্থালি পণ্য বিক্রিতে শীর্ষ কোম্পানিতে উঠে আসে।

তিনি আরো বলেন, একটি কোম্পানির সফলতার পেছনে থাকে দক্ষতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মীদের অবদান। দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখার জন্য সিঙ্গার সব সময় সচেষ্ট থাকত। এ কারণে সিঙ্গার ছিল দক্ষ কর্মীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি কোম্পানি। এর মাধ্যমে এ দেশের ক্রেতাসাধারণের মাঝে সিঙ্গার একটি ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এ কারণে মালিকানা পরিবর্তন হলেও সিঙ্গারের নামটি রয়েই গেছে। কারণ এ নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ক্রেতা সাধারণের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ১৮৫১ সালে আইজ্যাক সিঙ্গার সেলাই মেশিনের পেটেন্ট পাওয়ার পর এডওয়ার্ড ক্লার্কের সঙ্গে মিলে বিশ্বখ্যাত ‘সিঙ্গার করপোরেশন’ গঠন করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালের দিকে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক রিটেইল হোল্ডিং এনভির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রিটেইল হোল্ডিং বোল্ড বিভি এশিয়ার সিঙ্গার ব্যবসার সিংহভাগ মালিকানা কিনে নেয়। দীর্ঘ সময় রিটেইল হোল্ডিংসের হাতে ৫৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ার থাকার পর, ২০১৯ সালের মার্চ মাসে তারা এই শেয়ার তুরস্কের বিখ্যাত হোম অ্যাপ্লায়েন্স জায়ান্ট ‘আর্চেলিক’-এর কাছে বিক্রি করে দেয়। এর মাধ্যমেই মূলত বহুজাতিক এই কোম্পানির বর্তমান ব্যবসায়িক রূপান্তরের সূচনা হয়।

আরো কমলো স্বর্ণ ও রৌপ্যের দাম

ইলেকট্রিক ও রিকন্ডিশন গাড়ির মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে

ভোজ্যতেলের ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর

আর্থিক ও কাঠামোগত সংকটের মুখে রূপালী ব্যাংক

দ্বিতীয় দিনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে উঠল ৩২৭ কোটি টাকা

উৎপাদন-সেবায় ধীরগতি, আগস্টে কমল পিএমআই

সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে ৫০ শতাংশ কোটা কমাল সরকার

রিজার্ভ বিনিয়োগে তিন বছরে সর্বোচ্চ আয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

একীভূত ৫ ব্যাংকে আমানত তোলার চাপ কম, এক দিনে উত্তোলন ২৫০ কোটি টাকা

ব্যাংক কর্মকর্তাদের নিয়োগের ১ বছরের মধ্যে সনদ যাচাইয়ের নির্দেশ