ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা একই পরিবারের সদস্যরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একক বা যৌথভাবে ধারণ করতে পারবেন। সাধারণভাবে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করা যায় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা এবং ব্যাংক খাতের সুশাসনের ওপর এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইউসিবির মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১৪ক (১) ধারার বিধান থেকে ব্যাংকটিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি বা একই পরিবারের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার ধারণ করতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৌশলগত বিনিয়োগকারী আনার সুযোগ তৈরি করতেই এ ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর আর্থিক সক্ষমতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যাংকটির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে তার সম্পর্ক যাচাই করার পরই এ ধরনের ছাড় দেওয়া উচিত।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকের শেয়ার ধারণের সীমা নির্ধারণের মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের হাতে ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকানো। ব্যাংক পরিচালিত হয় আমানতকারীদের অর্থ দিয়ে। ফলে কোনো একক পরিবার ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, কৌশলগত বিনিয়োগকারী আনার কথা বলে আইনি সীমা শিথিল করা হলেও এর পেছনে সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কারণ থাকা প্রয়োজন। ব্যাংক খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেসব সতর্কতামূলক বিধান করা হয়েছে, সেগুলো থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনা ও বাস্তবভিত্তিক যুক্তি থাকা জরুরি।
জাহিদ হোসেনের মতে, স্পষ্ট ও যৌক্তিক ভিত্তি ছাড়া এ ধরনের ছাড় দেওয়া হলে আইনের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়। এটি সুশাসন ও আইনের শাসনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমন সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—উভয় সময়ের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জানা গেছে, ব্যাংকটি ৭৭৫ কোটি ১৯ লাখ টাকার রাইট শেয়ার ছাড়ার অনুমোদন পেয়েছিল। প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১০ টাকা। বিদ্যমান প্রতি দুটি শেয়ারের বিপরীতে একটি নতুন শেয়ার দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। তবে প্রস্তাবিত শেয়ারের মাত্র প্রায় ১৩ শতাংশের আবেদন জমা পড়ে, যার মূল্য প্রায় ১০২ কোটি টাকা। রাইট শেয়ারের জন্য যতটুকু আবেদন জমা পড়ে, তার প্রায় পুরোটাই নেন ব্যাংকটির উদ্যোক্তা-পরিচালকেরা। সাধারণ শেয়ারধারীদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম। এর মধ্যে বাজারে ইউসিবির শেয়ারপ্রতি দাম ছিল প্রায় ৯ টাকা, যা রাইট শেয়ারের প্রস্তাবিত ১০ টাকা দামের চেয়ে কম।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল ইউসিবি। ব্যাংকটিতে পারটেক্স গ্রুপেরও উল্লেখযোগ্য শেয়ার ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পর্ষদ পুনর্গঠন করে। অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জহিরকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়।