হোম > বাণিজ্য

সম্ভাবনার অপ্রচলিত বাজারেও পোশাক রপ্তানিতে টান

ইসমাঈল হোসাইন সোহেল

আমার দেশ গ্রাফিক্স

প্রচলিত গন্তব্যের বাইরে দেশের পোশাকশিল্পের আশার জায়গা ছিল অপ্রচলিত বাজার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সম্ভাবনাময় বাজারটিতেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে, যা ভাবিয়ে তুলছে এ খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের। একদিকে রপ্তানি কমে যাওয়া, অন্যদিকে শিল্পে নতুন করে আরো সমস্যা বাড়তে থাকায় সামনের দিনগুলোতেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কা আছে ব্যবসায়ীদের মাঝে। তবে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং রপ্তানি পণ্য বহুমুখী করার মধ্য দিয়ে এ সমস্যার ‍উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করছেন তারা। একইসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া দ্বিপক্ষীয় মেলা পুনরায় চালুর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সফরের মাধ্যমে সম্পর্কোন্নয়ন করা গেলে বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখা যাবে বলে মনে করেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা।

প্রসঙ্গত, ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রচলিত বড় বাজারের বাইরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির গন্তব্যগুলোকে অপ্রচলিত বা নতুন বাজার বলা হয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) অপ্রচলিত বাজারে ৬১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ, যা দেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ১৬ শতাংশ। এ বাজারে বাংলাদেশের সবচেয় বড় ক্রেতা জাপান। এ ছাড়া এখানে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, ভারত, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ব্রাজিলসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশ।

ইপিবির দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪,৮০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে কেবল পোশাক খাতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩,৮৭০ কোটি ডলারের। সে হিসাবে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১ শতাংশ অবদান পোশাক খাতের। অন্যদিকে বিশ্বে মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশ বা অর্ধেক যায় ইউরোপে। বাকি অর্ধেক রপ্তানি করা হয় অন্যান্য দেশে। তবে একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র, যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ। সে দিক থেকে অপ্রচলিত বাজারের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারে ৬১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ। আগের বছর এ বাজারে প্রায় ৬৪৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। সে হিসেবে সবশেষ অর্থবছরে নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৪.২৫ শতাংশ। এ সময় চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ব্রাজিল ছাড়া বাকি উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক। এর মধ্যে রাশিয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রায় ৩০ শতাংশ রপ্তানি কমেছে। আর সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ব্রাজিলে, যার হার ছিল প্রায় ১৮ শতাংশ।

অন্যদিকে নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এসব বাজারে সম্মিলিত রপ্তানি হয়েছে ৫৮ কোটি ২ লাখ ৬০ হাজার ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৪৮ শতাংশ কম। মোট পোশাক রপ্তানিতে এসব বাজারের অংশ প্রায় ১৪.৯৩ শতাংশ। বাজারগুলোর মধ্যে জাপানে রপ্তানি সামান্য বেড়েছে। জুলাইয়ে দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ১০ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের পোশাক, যা আগের বছরের তুলনায় দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে রপ্তানি কমেছে যথাক্রমে দশমিক ৩৩ শতাংশ ও ৩.৯৭ শতাংশ।

তবে এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি মূলত পোশাক খাতের সামগ্রিক প্রবণতার অংশ বলে মনে করেন এ খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতারা। এ ছাড়া গত অর্থবছরের একটি বড় সময় পণ্য শিপমেন্টে ঝামেলাও এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তারা। সে সঙ্গে এ অঞ্চলের অন্যতম বড় বাজার রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে লেনদেন ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় তৈরি পোশাক রপ্তানির মূল্য পরিশোধে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে অনেক ব্যবসায়ীর কোটি কোটি টাকার রপ্তানি আয় আটকে গেছে এবং দেশটিতে সরাসরি নতুন রপ্তানি অর্ডারও কমেছে। এ ছাড়া গত ছয় মাস ধরে জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে এ সময়ের রপ্তানি পরিস্থিতিতে এটির প্রভাবও স্পষ্টভাবে পড়েছে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু আমার দেশকে বলেন, অপ্রচলিত বাজারের এই নেতিবাচক প্রবণতা মূলত শিল্পের ওপর পড়া সামগ্রিক প্রভাবেরই অংশ। তবে অপ্রচলিত বাজারে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মাত্রা তুলনামূলক বেশি। এর মধ্যে সৌদি আরবের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার ক্ষেত্রে পেমেন্ট-সংক্রান্ত সমস্যা, দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন সময় রাশিয়ায় স্টোর বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো প্রভাব ফেলতে পারে। এসব কারণে রাশিয়ার বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অপ্রচলিত বাজারে লাভ ছাড়াও সরকারি প্রণোদনাটাকে মূল লক্ষ্য ধরে এখানে আসেন কোনো কোনো ব্যবসায়ী। সে কারণে প্রচলিত বাজারগুলোর ক্রেতাদের সঙ্গে যেমন সম্পর্ক থাকে, সেগুলো আসলে এখানে থাকে না। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন মেলার মাধ্যমে অপ্রচলিত বাজার সম্প্রসারণে কাজ করা হতো। কিন্তু নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার শেষদিকে ইপিবির মাধ্যমে হওয়া মেলাগুলো বন্ধ করে দেয়, যার ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগও কমে যায়। এ ছাড়া প্রতিযোগী দেশগুলোর সক্ষমতা ও উন্নত প্রযুক্তির কারণে এই বাজারে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।

এ বিষয়ে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও গালপেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউল আলম মীরু আমার দেশকে বলেন, এখনকার যে বৈশ্বিক অবস্থা, এটা আমাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগী দেশগুলো অবকাঠামো, স্থায়িত্ব, বিদ্যুৎ, গ্যাসÑসবকিছু মিলে আমাদের থেকে অনেকটা এগিয়ে আছে। আমরা শুধু কিছুটা এগিয়ে আছি আমাদের ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতার কারণে। বিশেষ করে গত চার-পাঁচ বছর ধরে আমাদের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। কারণ, আমাদের সব সূচক নিম্নমুখী। আমাদের স্ট্যাবিলিটি, পাওয়ার, ইনফ্রাস্ট্রাকচার, গ্রোথ, পলিটিক্যাল অবস্থাÑসবকিছু মিলে বিশ্বে আসলে আমাদের ইমেজটা এখন খুব ভালো যাচ্ছে না।

অপ্রচলিত বা নতুন বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, গত বছর আমাদের প্রায় সব প্রচলিত বাজারে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। যার ফলে নতুন বাজারেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকলে শুধু অপ্রচলিত বাজারই নয়, বরং গোটা শিল্পই হুমকির মুখে পড়বে। তবে আমরা কিছু মার্কেটের ব্যাপারে খুব আশাবাদী। যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া। রাশিয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার কথা জানিয়েছি বারবার। যদি সেগুলো নিয়ে আগাতে পারি, তাহলে নতুন বাজারে আমাদের অবস্থান আরো ভালো হতে পারে।

বাজারটি সম্প্রসারণে উদ্যোক্তা ও শিল্প মালিকদের নিয়ে উদ্যোগের বিষয়ে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অলরেডি আমরা এসব দেশে দ্বিপক্ষীয় সফর, দ্বিপক্ষীয় মেলার আয়োজন করেছি। জাপান ও রাশিয়াতেও করেছি। এরপর আমরা চেষ্টা করছি লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে কিছু কর্মসূচি হাতে নেওয়ার। এভাবে কাজ করলে অপ্রচলিত বাজারগুলো বাংলাদেশের পোশাক খাতে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

যে দামে স্বর্ণ ও রুপা বিক্রি হচ্ছে আজ

বড় মূলধনি ও অবকাঠামো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে শর্ত শিথিল

তাঁবু-আউটডোর পণ্যে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা বাংলাদেশের

আওয়ামী সংগঠনগুলোর উসকানিতে গার্মেন্টস শ্রমিকরা আন্দোলন করছে

সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের এমডিকে অপসারণ

সাবসিডিয়ারির ব্যবসা চালুর অনুমতি, ৮ প্রতিষ্ঠানকে সময় বেঁধে দিল বিএসইসি

সিএসইর কমোডিটি মার্কেট: নিবন্ধন সনদের নীতিগত অনুমোদন পেল ৬ ব্রোকারেজ হাউস

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সিদ্ধান্ত অক্টোবরেই আসবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

মঙ্গলবার থেকে ৫ দিন বন্ধ ব্যাংক ও শেয়ারবাজার

বন্ধ কারখানা চালুতে তহবিল, ঋণ বিতরণে গতি কম