উপসাগরীয় অঞ্চল ও রাশিয়া থেকে জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে ডিজেলের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আমদানি-নির্ভর বাজারগুলোতে ডিজেলের দাম এবং শোধনাগারগুলোর মুনাফার হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। খবর ডেইলি সাবাহর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার জ্বালানি খাতের আয় কমানোর লক্ষ্যে দেশটির তেল শোধনাগার ও রপ্তানি অবকাঠামোর ওপর ইউক্রেন তীব্র আক্রমণ করে। এতে রাশিয়ার তেল শোধন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিতে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্ববাজারে ডিজেল সরবরাহ কমে গেছে। ফলে ডিজেলের দাম ও শোধনাগারের মুনাফার ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর আগের দিন (গত ২৭ ফেব্রুয়ারি) জার্মানি ও ফ্রান্সে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল প্রায় ১.৮০ ইউরো বা ২.০৭ ডলার। এটা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রায় ২.৪০ ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ছিল প্রায় ৩.৭৫ ডলার, যা গত ১১ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ৬ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এমনকি রাশিয়াতেও বেড়েছে ডিজেলের দাম। গত ২৭ ফেব্রুয়ারির আগে দেশটিতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল প্রায় ৭৭ রুবল (৯১ সেন্ট), যা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বেড়ে ৮২-৮৩ রুবলে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণত প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল (৫ মিলিয়ন বিপিডি) পেট্রোলিয়াম পণ্য পারাপার হয়।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের অবসান না হওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। এই অচলাবস্থা ডিজেল বাজারের সংকটকে আরো গভীর করে তুলছে। কারণ এটি কেবল অপরিশোধিত তেল সরবরাহকেই ব্যাহত করছে না, বরং ডিজেল, জেট ফুয়েল, এলএনজির মতো পরিশোধিত পণ্যের ক্ষেত্রে এই সংকট প্রকট হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের শোধনাগারগুলোতে উৎপাদিত ডিজেল ও গ্যাসঅয়েলের একটি বড় অংশ সমুদ্রপথে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বাজারগুলোতে পাঠানো হয়। তাই হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটার ফলে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে প্রভাব পড়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে প্রস্তুতকৃত ডিজেলের প্রাপ্যতাও কমে যাচ্ছে।
আইইএর সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্ট মাসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ডিজেল ও গ্যাস-অয়েলের নিট রপ্তানির পরিমাণ ছিল গড়ে দৈনিক ৩ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় এই রপ্তানির পরিমাণ যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের মাত্র এক-চতুর্থাংশের সামান্য বেশি ছিল।
গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় আগস্ট মাসে উপসাগরীয় দেশ ও রাশিয়া থেকে ডিজেল ও গ্যাস-অয়েলের সম্মিলিত নিট রপ্তানি দৈনিক ১৬ লাখ ব্যারেল কম ছিল। উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারি মাসে সমুদ্রপথে বিশ্বব্যাপী পেট্রোলিয়াম পণ্য বাণিজ্যের প্রায় ৪৫ শতাংশই আসত এই দুটি অঞ্চল থেকে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্যমতে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ডিস্টিলেট (যেমন ডিজেল) ও জেট ফুয়েল শোধন থেকে প্রাপ্ত মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে, গ্যাসোলিন শোধন থেকে মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ।
আইইএ জানিয়েছে, আগস্ট মাসে আটলান্টিক অঞ্চলে তেল শোধন থেকে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা অর্জনের পেছনে ডিজেল ‘ক্র্যাক স্প্রেড’-এর (অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত ডিজেলের দামের পার্থক্য) বৃদ্ধি একটি প্রধান কারণ ছিল।