ইরান যুদ্ধের ৩০ দিন
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার ফলে বিশ্বব্যাপী পণ্যের দাম বৃদ্ধি, শেয়ারবাজারে ধসসহ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো জ্বালানি রেশনে বাধ্য হচ্ছে এবং তাদের দরিদ্র নাগরিকদের রক্ষায় জ্বালানিতে ভর্তুকি দিচ্ছে। খবর দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি)।
যুদ্ধ শুরুর পর গত ৩০ দিন ধরে পারস্য উপসাগরের শোধনাগার, পাইপলাইন, গ্যাসক্ষেত্র এবং ট্যাঙ্কার টার্মিনালগুলোতে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলা বিশ্বব্যাপী এই অর্থনৈতিক যন্ত্রণাকে কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
শুরু থেকেই এই যুদ্ধ তেলের বাজারে একটি বড় সঙ্কট তৈরি করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এই প্রণালিটি বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন করে। ইরান এই পথে যাতায়াতকারী ট্যাঙ্কারগুলোকে হুমকির মুখে ফেলায় সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।
কুয়েত ও ইরাকের মতো উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কারণ প্রণালিটি ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় তাদের তেল পাঠানোর কোনো বিকল্প পথ নেই। দৈনিক দুই কোটি ব্যারেল তেলের এই ঘাটতিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) ‘বিশ্ব তেলের বাজারের ইতিহাসে বৃহত্তম সরবরাহ সঙ্কট’ বলে অভিহিত করেছে।
গত ১৮ মার্চ বিশ্বের ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনকারী কাতারের রাস লাফান টার্মিনালে হামলা চালিয়েছে ইরান। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি জানিয়েছে, ওই হামলায় কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। এটি মেরামত করতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
গত শুক্রবার প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম তিন দশমিক চার শতাংশ বেড়ে ১০৫ দশমিক ৩২ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। যুদ্ধের আগে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল মাত্র ৭০ ডলার। একইভাবে প্রতি ব্যারেল মার্কিন ক্রুড অয়েলের দাম পাঁচ দশমিক পাঁচ শতাংশ বেড়ে ৯৯ দশমিক ৬৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (এমআইটি) জ্বালানি অর্থনীতিবিদ ক্রিস্টোফার নিটেল বলেন, এক সপ্তাহ বা বড়জোর দুই সপ্তাহ আগে আমি হয়তো বলতাম—যদি যুদ্ধ সেদিনই থেমে যেত, তবে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবগুলো খুব সামান্য হতো। কিন্তু আমরা যা দেখছি তা হলো অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যার অর্থ এই যুদ্ধের পরিণতি দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ঐতিহাসিকভাবে তেলের দামের এ ধরনের আকস্মিক বৃদ্ধি বিশ্বমন্দার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই যুদ্ধ ১৯৭০-এর দশকের সেই ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক স্মৃতি ‘স্ট্যাগফ্লেশন’কে (উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও স্থবির প্রবৃদ্ধি) আবার ফিরিয়ে এনেছে।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের কারমেন রেইনহার্ট বলেন, এর ফলে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং নিম্ন প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে।
আইএমএফের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথ সম্প্রতি লিখেছেন, যুদ্ধের আগে এই বছর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তিন দশমিক তিন শতাংশ হবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে তেলের গড় দাম ব্যারেল প্রতি ৮৫ ডলার হলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক তিন থেকে শূন্য দশমিক চার শতাংশ কমে যেতে পারে।
বিশ্বের প্রধান দুটি সারের রপ্তানিতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় অবদান রয়েছে। এখান থেকে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া এবং এক-চতুর্থাংশ অ্যামোনিয়া সার সরবরাহ করা হয়। এই অঞ্চলের উৎপাদকরা একটি বিশেষ সুবিধা পায়। তা হলোÑসস্তা প্রাকৃতিক গ্যাসের সহজলভ্যতা, যা নাইট্রোজেন সারের প্রধান কাঁচামাল।
বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ নাইট্রোজেন সার হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হয় । যুদ্ধের শুরু থেকে এই পথটি অবরুদ্ধ হওয়ায় বর্তমানে ইউরিয়ার দাম ৫০ শতাংশ এবং অ্যামোনিয়ার দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে। আলপাইন ম্যাক্রোর পণ্য কৌশলবিদ কেলি জু এক মন্তব্যে লিখেছেন, এর ফলে বড় কৃষিপ্রধান দেশ ব্রাজিল অত্যন্ত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কারণ তারা তাদের প্রয়োজনীয় সারের ৮৫ শতাংশই আমদানি করে। এমনকি বড় সার উৎপাদনকারী দেশ মিশরও পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক গ্যাসের অভাবে উৎপাদন সংকটে পড়েছে।
সারের উচ্চমূল্য শেষ পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যকে আরো ব্যয়বহুল ও দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ কৃষকরা খরচ বাঁচাতে কম সার ব্যবহার করবে এবং এতে ফলনও কম হবে । খাদ্য সরবরাহের এই সংকট দরিদ্র দেশগুলোর পরিবারগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের উপজাত হিলিয়াম চিপ তৈরি, রকেট ও মেডিকেল ইমেজিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। কাতার তাদের রস লাফান কেন্দ্রে হিলিয়াম উৎপাদন করে এবং বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ হিলিয়াম সরবরাহ করে। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী হিলিয়ামের সরবরাহও বিঘ্নিত হয়েছে
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরল বলেন, সংকট এভাবে চলতে থাকলে কোনো দেশই এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না।
ডালাস ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সেন্টার ফর এনার্জি অ্যান্ড দ্য ইকোনমির পরিচালক লুৎজ কিলিয়ান বলেন, দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হবে। কারণ তারা অবশিষ্ট তেল ও গ্যাস কেনার প্রতিযোগিতায় ধনী দেশগুলোর কাছে হেরে যাবে।
এশিয়া অঞ্চল সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে। কারণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রবাহিত ৮০ শতাংশেরও বেশি তেল ও এলএনজি সেখানেই যায়।
যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা সুরক্ষিত অবস্থায় আছে। তেল রপ্তানিকারক দেশ হওয়ায় দেশটির জ্বালানি কোম্পানিগুলো উচ্চমূল্যের সুফল পাচ্ছে। এছাড়া এলএনজির দামও অন্যান্য জায়গার তুলনায় কম। কারণ তাদের রপ্তানি কেন্দ্রগুলো শতভাগ সক্ষমতা ব্যবহার করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানের চেয়ে বেশি এলএনজি রপ্তানি করতে পারছে না। এটা দেশের পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও দাম স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে।
তবে, মার্কিন ভোক্তাদের মধ্যে যারা আগে থেকেই উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে হতাশ ছিল, তাদের ওপর গ্যাসোলিনের বর্ধিত মূল্য চাপ সৃষ্টি করেছে । এএএ-এর তথ্যমতে, প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম এক মাস আগের দুই দশমিক ৯৮ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় চার ডলারে পৌঁছেছে।
বিশ্ব অর্থনীতি মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মতো বারবার আসা ধাক্কাগুলো কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা দেখিয়েছে। তাই ইরান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতিও কাটিয়ে ওঠা যাবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু পারস্য উপসাগরের জ্বালানি অবকাঠামোতে ক্রমাগত হুমকির কারণে সেই আশা ফিকে হয়ে আসছে।
ড্যালাস ফেডের অর্থনীতিবিদ কিলিয়ান বলেন, কাতারের এলএনজি স্থাপনার যে ক্ষতি হয়েছে তা মেরামত করতে সম্ভবত কয়েক বছর লেগে যাবে। কুয়েতের মতো দেশের শোধনাগার ও উপসাগরীয় ট্যাঙ্কারগুলো মেরামত করা প্রয়োজন। সবকিছু অনুকূলে থাকলেও পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর হবে ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে এই সংঘাতের কোনো ইতিবাচক অর্থনৈতিক দিক নেই। এই মুহূর্তে বড় প্রশ্ন হলো—এই শত্রুতা আর কতদিন চলবে এবং এটি কতটা অর্থনৈতিক ক্ষতি করবে?