বাংলাদেশের অর্থনীতি চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে এগোতে পারে। তবে সেই পুনরুদ্ধারের গতি খুব দ্রুত হবে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রবৃদ্ধি এখনও চাপের মধ্যেই থাকবে বলে মনে করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকের (এডিও) হালনাগাদ প্রতিবেদনে সংস্থাটি চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। এটি সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের সম্ভাব্য ৩ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও, অতীতের তুলনায় এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে কম। যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে ওই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হয়েছে।
এডিবির মতে, গত অর্থবছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রপ্তানি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং প্রতিকূল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রত্যাশার তুলনায় প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে। মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যক্তিগত ভোগব্যয়ও সীমিত হয়েছে। পাশাপাশি আমদানির মাঝারি প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানি আয়ের দুর্বলতা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক চাহিদার শ্লথ অবস্থারই প্রতিফলন।
তবে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমা, ব্যবসা পরিচালনার নিয়মকানুন সহজ করা, সুশাসনের উন্নয়ন, কর প্রশাসনে সংস্কার এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশা করছে সংস্থাটি। শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সেবা খাতের স্থিতিশীলতাও অর্থনীতিকে সহায়তা করবে।
তবে এডিবি সতর্ক করে বলেছে, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার খুব দ্রুত হবে না। কারণ ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রবৃদ্ধির পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পখাত চাপের মধ্যে থাকতে পারে। অন্যদিকে সারের ঘাটতি কৃষি উৎপাদনের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রাখা হলেও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়ানো হয়েছে। গত এপ্রিলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে তা বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে।
সংস্থাটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সম্প্রতি জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রভাব পরিবহন, পরিষেবা এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের মূল্যে পড়বে। পাশাপাশি বিনিময় হারজনিত চাপ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের দ্বিতীয় দফার প্রভাব এবং খাদ্য ও সেবা খাতে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে দাম কমার গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর থাকবে।
এডিবির বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাতসুবাগা বলেন, কঠিন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সেবা খাতের স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে চলমান সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেন এবং সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেলের আন্তর্জাতিক দাম আরও বাড়লে আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পেতে পারে।
এ ছাড়া বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন শুল্ক আরোপ বা অন্যান্য বিধিনিষেধ, প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর অর্থনৈতিক ধীরগতি, বৈদেশিক অর্থায়নের কঠোর পরিবেশ, বিনিময় হারের চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।