দেশের ৯টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে লিকুইডেশনের যৌক্তিকতা যাচাইয়ে শুনানি শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেবে সরকার। তবে প্রাতিষ্ঠানিক আমানত এবং অন্যান্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।
অবসায়নের প্রক্রিয়ায় থাকা ৯টি এনবিএফআই হলো—ফাস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৭৫ থেকে ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের শেষে এনবিএফআই খাতে মোট খেলাপি ঋণের ৫২ শতাংশ বা ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা এ ৯ প্রতিষ্ঠানের ছিল। বর্তমানে এ অঙ্ক আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আগের সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির কারণেই খেলাপি ঋণ এত বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের (পরে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিকে হালদার চারটি এনবিএফআই—পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, ফাস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি থেকে অন্তত সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের লিকুইডেশন (অবসায়ন) প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কোনো যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে কি না, তা জানতে শুনানি শুরু হয়েছে। গত বুধবার শুনানিতে পাঁচটি এবং গতকাল বৃহস্পতিবার দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ প্রায় ৯৯ শতাংশের কাছাকাছি। বাস্তবতা হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার সুযোগ নেই। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় দেখছে না। প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করা হলে সরকার কেবল ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা পরিশোধ করবে। প্রাতিষ্ঠানিক এবং অন্যান্য ব্যাংক বা ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের পাওনা সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৯টি এনবিএফআইয়ের মোট আমানতের পরিমাণ ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানত তিন হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হলে সরকারকে এই পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। ব্যক্তি আমানতের মধ্যে ফাস ফাইন্যান্সের ৬৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা, বিআইএফসির ৭৫ কোটি ২০ লাখ, প্রিমিয়ার লিজিংয়ের ৭৩ কোটি ৬৪ লাখ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৩৫ কোটি ৬৩ লাখ, জিএসপি ফাইন্যান্সের ৪৯ কোটি ৭১ লাখ, প্রাইম ফাইন্যান্সের ৩২৮ কোটি ৩১ লাখ, অ্যাভিভা ফাইন্যান্সের ৮০৯ কোটি ৭৫ লাখ, পিপলস লিজিংয়ের এক হাজার ৪০৫ কোটি ৭২ লাখ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৬৪৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা রয়েছে। এছাড়া ব্যাংক ও করপোরেট গ্রাহকদের আমানত রয়েছে ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।
বর্তমানে দেশে ৩৫টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০টি প্রতিষ্ঠান কেন বন্ধ করা হবে না—এ মর্মে গত বছরের মে মাসে নোটিস দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৯টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার বা ঘুরে দাঁড়ানোর কর্মপরিকল্পনা সন্তোষজনক না হওয়ায় সেগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও সম্মতি পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানান, অবসায়নের পথে থাকা ৯টি রুগ্ন এনবিএফআইয়ের ব্যক্তি পর্যায়ের আমানতকারীরা আগামী ফেব্রুয়ারিতে রমজানের আগেই তাদের মূল টাকা ফেরত পাবেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ মূল্যায়নের কাজ শুরু করা হবে। মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ইতিবাচক না নেতিবাচক। এর ভিত্তিতেই শেয়ারহোল্ডাররা কিছু পাবেন কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে সরকার মৌখিকভাবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছে। তবে আমানতকারীরা কেবল তাদের মূল অর্থ ফেরত পাবেন, কোনো সুদ দেওয়া হবে না।