হোম > বাণিজ্য > ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

আস্থার সংকট ও অস্বচ্ছতা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে বীমা শিল্প

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন

আবু আলী

ফাইল ছবি

বছরের পর বছর জমে থাকা আস্থার সংকট, তথ্য গোপনের অপচেষ্টা আর দীর্ঘমেয়াদি বকেয়া দাবির বেড়াজালে স্থবির হয়ে পড়া দেশের বীমা খাতে এবার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনিয়ম দূর করে বীমা খাতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে। এক্ষেত্রে বকেয়া দাবি পরিশোধ আমাদের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য। গ্যারেজে বা আড়ালে সার্ভার লুকিয়ে রেখে কিংবা ভুয়া তথ্য দিয়ে আর কোনো প্রতিষ্ঠান পার পাবে না। দেশের বীমা খাতের বর্তমান সংকট, ডিজিটাল রূপান্তর, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে সম্প্রতি আমার দেশ-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবু আলী।

আমার দেশ : দেশের বীমা শিল্পের বর্তমান অবস্থা কেমন এবং তদারকির ক্ষেত্রে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে?

মীর নাদিয়া নিভিন : লাইফ ও নন-লাইফ—দুই খাতের অনেক কোম্পানির তথ্য ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। আইডিআরএকে কোম্পানিগুলো যে তথ্য দেয়, তা সব সময় প্রকৃত তথ্য নয়। একাধিক সার্ভার থাকায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে কোম্পানিগুলোর ব্যবসা, প্রিমিয়াম আয় ও আর্থিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্রও থাকে না। শুধু আর্থিক প্রতিবেদন দেখে একটি কোম্পানির প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়। ২০২৬ সালে বসে যদি ২০২৫ সালের অডিট প্রতিবেদন পাওয়া যায়, তাহলে সেই তথ্য দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি কার্যকরভাবে তদারকি করা কঠিন।

আমার দেশ : এই অস্বচ্ছতা দূর করতে এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় আপনাদের পরিকল্পনা কী?

মীর নাদিয়া নিভিন : আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পুরোপুরি রিস্ক বেজড সুপারভিশন বা ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর মাধ্যমে কোনো কোম্পানি কী ধরনের তথ্য দিচ্ছে, কোথায় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে এবং কোন প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে—তা আরো দ্রুত ও কার্যকরভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রথম হিসেবে আইডিআরএ এ ধরনের ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে।

আমার দেশ : বীমা খাতে গ্রাহকের ভয়াবহ আস্থার সংকট রয়েছে। গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে কী পদক্ষেপ নেবেন?

মীর নাদিয়া নিভিন : আমাদের সংস্কার পরিকল্পনা মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। প্রথমত, গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইডিআরএর সক্ষমতা বৃদ্ধি। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও টেকসই বীমা খাত গড়ে তোলা। এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে গ্রাহকের আস্থা। বর্তমানে বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার প্রায় ৫৭ শতাংশ, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মানুষ যদি বীমা খাতের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তাহলে পুরো খাতই সংকটে পড়বে। তাই দাবি নিষ্পত্তিই এখন আমাদের এক নম্বর অগ্রাধিকার।

আমাদের দেশ : তথ্য গোপনের সুযোগ বন্ধে অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে কোনো যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না?

মীর নাদিয়া নিভিন : বীমা কোম্পানিগুলোর তথ্য গোপনের সুযোগ বন্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংক হিসাব শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার আলোচনা হয়েছে এবং তারা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি বিএসইসির সঙ্গেও ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে।

আমার দেশ : বীমা খাতের ডিজিটাল রূপান্তর এবং পলিসির স্বচ্ছতা আনতে নতুন কোনো উদ্যোগ আছে কি?

মীর নাদিয়া নিভিন : ব্যাংক হিসাব নম্বরের মতো পুরো বীমা খাতের জন্য একটি অভিন্ন ‘ইউনিক পলিসি আইডি চালু করা হচ্ছে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে পুরো খাতে এ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে। এটি চালু হলে ভুয়া প্রিমিয়াম দেখানো কিংবা তথ্য গোপনের সুযোগ কমে যাবে। এছাড়া নন-লাইফ খাতে এলসি খোলার আগে ইউনিক কভার নোট আইডি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে, যাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম থেকে তা যাচাই করা যায়।

আমার দেশ : অনেক কোম্পানি বছরের পর বছর ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ দাবি পরিশোধ করছে না। এক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

মীর নাদিয়া নিভিন : বীমা দাবি পরিশোধের একটা সাধারণ সূত্র হলো ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ নীতি। অর্থাৎ যাদের বীমা দাবি প্রথম ছিল, তাদের দাবি আগে পূরণ করতে হবে। কিন্তু অনেক কোম্পানি তাদের কাছে যে পরিমাণ বীমা দাবি আছে সে পরিমাণ টাকা নেই। সেজন্য যাদের দাবি আগে দেওয়ার কথা তাদের না দিয়ে যেসব গ্রাহক মামলা করেছে, সেই গ্রাহকদের টাকা আগে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা বীমা কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছি, সম্পদ বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা একটি পৃথক ব্যাংক হিসাবে রাখতে হবে। সেই হিসাব থেকে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ নীতির ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে পুরোনো দাবি আগে পরিশোধ করা হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় আইডিআরএর তত্ত্বাবধান হবে এবং এজন্য প্রতিটি বীমা কোম্পানিতে একটি করে অডিট টিম থাকবে।

আমার দেশ : ঘুস বা দুর্নীতির অভিযোগ পেলে আইডিআরএ কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে?

মীর নাদিয়া নিভিন : কোনো বীমা কোম্পানি আইডিআরএর কোনো কর্মকর্তাকে ঘুস দেওয়ার চেষ্টা করলে সতর্ক করার পরিবর্তে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইভাবে আইডিআরএর কোনো কর্মকর্তা কোনো কোম্পানির কাছে ঘুস চাইলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্নীতির ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানি হোক বা আইডিআরএর কর্মকর্তা—কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

আমার দেশ : মাত্র ১৫০ জন জনবল দিয়ে ৮২টি কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করা কতটা চ্যালেঞ্জিং?

মীর নাদিয়া নিভিন : বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে প্রায় ৭,০০০ কর্মী দিয়ে ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে মাত্র প্রায় ১৫০ জন জনবল দিয়ে আইডিআরএকে ৮২টি বীমা কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। এছাড়া ২০১০ সালের বীমা আইন বর্তমান আর্থিক খাতের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যা সময়ের সঙ্গে হালনাগাদ করা প্রয়োজন। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কোম্পানিগুলোকে আইডিআরএর নির্দেশনা অবশ্যই মানতে হবে; অন্যথায় তাদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা কঠিন করে দেওয়া হবে। পলিসিহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করাই আমাদের মূল দায়িত্ব।

আমাদের কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সহযোগিতায় বিশেষ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে তারা ‘রিস্ক-বেসড সুপারভিশন’ সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেন। এর পাশাপাশি আমরা ‘ইনসু-কমপ্লেন্ট’ নামক একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করতে যাচ্ছি। গ্রাহকরা এখন দূরে কোথাও না গিয়ে অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি কমপ্লেইন্ট দিতে পারবেন। সেই কমপ্লেইন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও আমাদের ডেটাবেসে চলে যাবে। ১৫ দিন (হলুদ) ও ৩০ দিন (লাল) এজিং সিস্টেমের মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তি না হলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারব। ভালো কোম্পানিগুলো এতে কোঅপারেট করলেও দুষ্ট কোম্পানিগুলো এগুলো পছন্দ করছে না। তবে আমরা এই খাতকে সম্পূর্ণ ক্লিনআপ করতে বদ্ধপরিকর।

আমার দেশ : দাবি নিষ্পত্তি করতে গিয়ে যেসব কোম্পানি গড়িমসি করছে, তাদের বিরুদ্ধে আপনারা কী ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

মীর নাদিয়া নিভিন : দাবি না দেওয়া বড় কোম্পানিগুলোর মালিকপক্ষ ও ব্যবস্থাপনাকে নিয়ে বৈঠক করেছি। তাদের পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছি যে, আগের পর্ষদ কে ছিল তা দেখার বিষয় নয়; জবাবদিহি সরাসরি পলিসিহোল্ডারদের কাছে। তারা কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় দেখালে আমি স্পষ্ট করেছি যে, আমি তাদের সঙ্গে কোলাবোরেটিভ ওয়েতে কাজ করতে চাই। কিন্তু কথা না শুনলে প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম বন্ধ করা, লাইসেন্স বাতিল করা বা সলভেন্সি মারজিনের মতো কঠোর হাতিয়ার আমাদের হাতে আছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে টক্কর দিয়ে কোনো কোম্পানি টিকে থাকতে পারে না।

আমার দেশ : গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

মীর নাদিয়া নিভিন : আমি নিজে ইনস্টিটিউশন রিফর্ম বা সংস্কারের মানুষ। আমার যত সংস্কারের কাজ, তার প্রায় সবই আপনাদের মিডিয়া রিপোর্ট পড়ে প্রবলেমগুলো জেনেই করেছি। কারণ কোম্পানিগুলো অনেক সময় ভুল তথ্য দেয়, কিন্তু মিডিয়ার মাধ্যমে আমি রিয়েল চিত্রটা বুঝতে পারি। এই খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে গণমাধ্যমের এই সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব অত্যন্ত জরুরি।

পাকিস্তানকে কোচিং করানোর ইচ্ছা থাকলেও ‘হট সিটে’ ভয় মুশতাকের

যুদ্ধের অর্থ জোগাতে পর্নোগ্রাফি বৈধ করতে চায় ইউক্রেন

চুয়াডাঙ্গায় অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাই

নেপালে বন্যার ধ্বংসস্তূপে ১০ দিন পরও জীবিত ৬৪ বছরের নারী

যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির বোঝা পুরো বিশ্বের ওপর চাপাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র: বাঘাই

শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনার সংস্কৃতি কী বার্তা দিচ্ছে

নেপালের ভয়াবহ বন্যায় পরিবারহারা শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ধীরগতির সংস্কারে নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি কাজ

ইরানের খার্গ দ্বীপে হামলার এআই নির্মিত ছবি পোস্ট করলেন ট্রাম্প

ডিজেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকরা