বাংলাদেশের একমাত্র কোম্পানি হিসাবে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে (এআইএম) তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো ফার্মাসিটিউক্যালস। ২০০৫ সালে কোম্পানিটি তালিকাভুক্ত হয়। তালিকাভুক্তির দুই দশক পর তালিকাচ্যুতির বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের অন্যতম ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানটি। নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব বিবরণী প্রকাশে ব্যর্থতার কারণে আগামী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই এআইএম থেকে তালিকাচ্যুত হতে পারে কোম্পানিটি।
এআইএম বিধি ১৯ অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির আর্থিক বছর শেষ হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব বিবরণী প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু বেক্সিমকো ফার্মা ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে কোম্পানিটির গ্লোবাল ডিপোজিটরি রিসিপ্ট (জিডিআর) লেনদেন চলতি বছরের ২ জানুয়ারি থেকে স্থগিত রয়েছে।
এআইএমের বিধি ৪১ ধারায় বলা হয়েছে, ছয় মাস জিডিআর লেনদেন স্থগিত থাকলে কোম্পানিটির তালিকাভুক্তি বাতিল করা হতে পারে। সে হিসাবে আগামী ২ জুলাই জিডিআর লেনদেনের ছয় মাস পূর্ণ হতে চলছে। ফলে বেক্সিমকো ফার্মা তালিকাচ্যুতির বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে তালিকাচ্যুতির ঝুঁকি এড়াতে লন্ডনে তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো ফার্মার ছয়জন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে গত সপ্তাহে বৈঠক করে বিষয়টির সম্মানজনক সমাধানের উদ্যোগ নিতে চিঠি দিয়েছে। বিষয়টি স্বীকার করে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র আবুল কালাম আমার দেশকে বলেন, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং দেশের ভাবমূর্তি বিবেচনায় নিয়ে বিএসইসি বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখছে। এ জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বেক্সিমকো ফার্মার সাধারণ শেয়ার লেনদেন স্বাভাবিক রয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে কোম্পানিটির সাধারণ শেয়ার লেনদেন হলেও লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে সাধারণ শেয়ারের পরিবর্তে জিডিআর লেনদেন হয়ে থাকে।
প্রসঙ্গত, জিডিআর হলো এমন একটি আর্থিক দলিল, যার মাধ্যমে একটি দেশের কোম্পানির শেয়ার অন্য দেশের শেয়ারবাজারে কেনাবেচা করা যায়। তখন কোম্পানিটির শেয়ার একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকের কাছে জমা রাখা হয়। সেই ব্যাংক শেয়ারের বিপরীতে জিডিআর ইস্যু করে। এরপর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা জিডিআর কিনে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে পারেন, সরাসরি বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে না গিয়েও। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে (এলএসই) বেক্সিমকোর জিডিআর ইস্যু ও পরিচালনার ক্ষেত্রে মূল ট্রাস্টি বা ডিপোজিটরি ব্যাংক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে সিটিব্যাংক এনএ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি বেক্সিমকো গ্রুপের তিন কোম্পানিতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এর মধ্যে বেক্সিমকো ফার্মাও ছিল। অপর কোম্পানি দুটি হলো বেক্সিমকো লিমিটেড ও শাইনপুকুর সিরামিকস। কিন্তু বিএসইসির এ সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট করে কোম্পানিটি। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বিএসইসির সিদ্ধান্তের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে বিএসইসির সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা স্থগিত হয়ে যায়। আপিল বিভাগ নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করায় চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন সভায় বেক্সিমকো ফার্মাসহ তিন কোম্পানিকে ১২ দিনের মধ্যে পর্ষদ সভা বাস্তবায়নে কোম্পানিগুলোর এমডি, সিএফও এবং কোম্পানির সচিবকে নির্দেশ দেয়। কিন্তু নির্দেশ দেওয়া হলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব বিবরণী প্রকাশ নিয়ে জটিলতার অবসান ঘটেনি।
বিষয়টি জানতে বেক্সিমকো ফার্মার সচিব মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহর মতামত জানতে চেয়ে ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে গা-ঢাকা দেন সালমান এফ রহমান।
এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ওই বছরের ১৩ আগস্ট আটক হয়ে বর্তমানে জেলহাজতে আছেন। কারসাজিসহ নানা কারণে বহুল আলোচিত সালমান এফ রহমানকে আজীবনের জন্য পুঁজিবাজারে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইএফআইসি ব্যাংক গ্যারান্টেড শ্রীপুর টাউনশিপ গ্রিন জিরো কুপন বন্ড ও বেক্সিমকো গ্রিন সুকুকের অর্থ উত্তোলন-সংক্রান্ত নানা অনিয়মের জন্য ১০০ কোটি টাকা জরিমানাও করেছিল রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন বিএসইসি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত ও অনুমোদনের জন্য কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সভা এবং বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু পর্ষদ গঠন নিয়ে আইনি জটিলতার কারণে বেক্সিমকোর পর্ষদের সভা হচ্ছে না। ফলে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় চলতি বছরের ২ জানুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বেক্সিমকো ফার্মার জিডিআর লেনদেন স্থগিত রয়েছে।
উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত আসার পর বোর্ড মিটিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদিত ও প্রকাশিত হলেই কেবল লন্ডনে আবার লেনদেন চালু করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন বিএসইসির শীর্ষ এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘এজন্য আগে আদালতের মামলার নিষ্পত্তি দরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কোম্পানিটির মোট ৪৪ কোটি ৬১ লাখ ১২ হাজার ৮৯টি (৪৪৬.১১ মিলিয়ন) শেয়ার বা জিডিআর রয়েছে। লন্ডন এক্সচেঞ্জের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এর মার্কেট ক্যাপিটাল প্রায় ১৮ কোটি ৯৬ লাখ পাউন্ড বা ১৮৯.৬০ মিলিয়ন পাউন্ড। টাকার হিসাবে প্রায় তিন হাজার ১২৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
এমই