হোম > বাণিজ্য > ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

নির্ধারিত ফি মানছে না অডিট ফার্ম

কাওসার আলম

নিরীক্ষার (অডিট) মান নিশ্চিত করতে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিষ্ঠানের জন্য ন্যূনতম অডিট ফি নির্ধারণ করে দিলেও তা মানছে না ফার্মগুলো। নির্ধারিত ফি অনুসরণ না করে অনেক অডিট ফার্ম কম দর প্রস্তাব করে নিরীক্ষার কাজ নিচ্ছে। এর ফলে নিরীক্ষার গুণগত মান ও আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নির্ধারিত ফির চেয়েও কম মূল্যে অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন করার বিষয়টি স্বীকার করে আইসিএবি কাউন্সিলের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে বলেন, ন্যূনতম ফির চেয়ে কম মূল্যে অনেক ফার্মই নিরীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। এর ফলে পেশাগত শৃঙ্খলা যেমন ভেঙে পড়ছে, একইসঙ্গে আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

এদিকে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ উপলক্ষে গত ৫ অক্টোবর আইসিএবি কার্যালয়ে আয়োজিত সেমিনারে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান কম ফিতে নিরীক্ষার কাজ করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নিরীক্ষকরা অযৌক্তিকভাবে কম ফিতে নিরীক্ষার কাজ করছেন, যা নিরীক্ষার গুণগত মানের জন্য উদ্বেগজনক। শুধু ফি নির্ধারণ করলেই হবে না, তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নও করতে হবে। নির্ধারিত ফির চেয়ে কম নিয়ে নিরীক্ষার কাজ করলে সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকদের অনুমোদিত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলে (এফআরসি) পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অডিট ফি কমিয়ে কাজ পাওয়ার এই প্রতিযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে নিরীক্ষা পেশার জন্য ক্ষতিকর। কারণ, একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষা করতে হলে লেনদেন, সম্পদ, দায়, আয়-ব্যয়, ঋণ, পাওনা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করতে হয়। প্রতিষ্ঠানভেদে এ কাজে সময় ও জনবলের প্রয়োজনও ভিন্ন। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজের তুলনায় ফি অস্বাভাবিক কম হলে নিরীক্ষার পেছনে পর্যাপ্ত সময় ও দক্ষ জনবল নিয়োগ কঠিন হয়ে পড়ে। এতে নিরীক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নিরীক্ষকদের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) নির্বাহী পরিচালক তারেক কামাল আমার দেশকে বলেন, কম ফিতে অডিট করার কারণে কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, ৫০ কোটি টাকা টার্নওভারের একটি কোম্পানি যদি ৫০ হাজার টাকা অডিট ফি দেয়, তাহলে সে রিপোর্টের মান কেমন হবেÑএটা সহজেই অনুমেয়। তবে আইসিএবির অডিট ফি সূচিতে কিছুটা ত্রুটি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এরই মধ্যে নতুন নিরীক্ষা ফি নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত জুলাই মাসে বিএসইসি ও আইসিএবির মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নিরীক্ষার মান উন্নয়নে ঝুঁকিভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ অডিট ফি কাঠামো তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়। একই মাসে অর্থ বিভাগের সচিবের সঙ্গে আইসিএবির বৈঠকেও অডিট ফি কাঠামো নির্ধারণ ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরীক্ষার মান বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইসিএবি প্রেসিডেন্ট সাব্বির আহমেদ আমার দেশকে বলেন, ২০১৬ সালে অডিট ফি নির্ধারণ করা হলেও এটি বাস্তবতার আলোকে করা হয়নি। এজন্য নতুন করে অডিট ফি নির্ধারণে গভীর পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অনেক কোম্পানি আছে যারা বড় আকারে বিজনেস শুরু করে; কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে তারা ডরমেন্ট কোম্পানিতে পরিণত হয়; ফলে তাদের জন্য কম অডিট ফি দেওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়ে। এজন্য আমরা অডিট ফি নির্ধারণে কোম্পানির ঝুঁকি ও জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছি। যে কোম্পানির ঝুঁকি বেশি এবং জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা বেশি থাকবে, সে কোম্পানির অডিট ফিও বেশি হবে বলে জানান তিনি।

আইসিএবির ফি সূচি অনুযায়ী তালিকাভুক্ত উৎপাদনশীল কোম্পানির মোট সম্পদ অথবা বার্ষিক টার্নওভার ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে ন্যূনতম অডিট ফি তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা। একইভাবে তালিকাভুক্ত অন্যান্য খাতের কোম্পানি, সেবাপ্রতিষ্ঠানসহ যেসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ অথবা টার্নওভার ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত, তাদের ন্যূনতম অডিট ফি পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ ও অগ্রিম ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে ন্যূনতম ফি তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা। বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে মোট প্রিমিয়াম ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে একই পরিমাণ ফি নির্ধারিত রয়েছে। আর মোবাইল অপারেটরদের ক্ষেত্রে সম্পদ বা টার্নওভার পাঁচ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হলে ন্যূনতম অডিট ফি ২৫ লাখ টাকা।

তালিকাবহির্ভূত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রেও পৃথক ফি কাঠামো রয়েছে। এ ধরনের কোম্পানির মধ্যে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি, মোবাইল অপারেটর এবং অন্যান্য খাতের প্রতিষ্ঠানের জন্য তাদের ব্যবসার ধরন ও আকার বিবেচনায় ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে সম্পদ অথবা টার্নওভার পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে ন্যূনতম অডিট ফি ৫০ হাজার টাকা। সম্পদ বা টার্নওভারের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিও বাড়বে। পাঁচ থেকে ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদ বা টার্নওভার থাকা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ফি ৫০ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি পায়। ২৫ থেকে ৫০ কোটি টাকার ক্ষেত্রে তা এক লাখ টাকা থেকে, ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকার ক্ষেত্রে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে এবং ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার ক্ষেত্রে দুই লাখ ২৫ হাজার টাকা থেকে নির্ধারিত হয়েছে। ১৫০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ফি তিন লাখ টাকা এবং ২৫০ কোটি টাকার বেশি হলে পাঁচ লাখ টাকা থেকে ফি নির্ধারণের কাঠামো রয়েছে।

শুধু কোম্পানি নয়, কোম্পানির বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্যও অডিট ফি নির্ধারণ করেছে আইসিএবি। বিদেশি অনুদান ব্যবহারকারী অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তহবিল ব্যবহারের পরিমাণ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে ন্যূনতম অডিট ফি ৫০ হাজার টাকা। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ঋণ স্থিতি পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে ন্যূনতম ফি এক লাখ টাকা। প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ফান্ড ও কল্যাণ তহবিলের মোট সম্পদ ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে ন্যূনতম ফি ৩০ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রোপ্রাইটরশিপ, পার্টনারশিপ ও সমবায় প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বা টার্নওভার পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত হলে ন্যূনতম ফি ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু গত এক দশক আগে ফি নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আইসিএবির ফি সূচিতে ব্যাংকের ক্ষেত্রে ৫০টি পর্যন্ত শাখা থাকলে প্রধান কার্যালয়ের নিরীক্ষার ন্যূনতম ফি ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অবশ্য ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ব্যাংকের বহিঃনিরীক্ষার জন্য আলাদা ফি নির্ধারণ করেছে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)।

এদিকে আইসিএবির ফি সূচিতে কম ফির বিনিময়ে নিরীক্ষার কাজ গ্রহণ করাকে আন্ডারকাটিং হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আন্ডারকাটিংকে পেশাগত অসদাচরণ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। এজন্য ফার্মের অডিট ওয়ার্কিং পেপার পর্যালোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিরীক্ষার ক্ষেত্রে এ পর্যালোচনায় গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পর্যালোচনায় নিরীক্ষার মান সন্তোষজনক না হলে সংশ্লিষ্ট ফার্ম বা অংশীদারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু যথাযথ মনিটরিং না থাকার কারণে আন্ডারকাটিং করেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে অডিট ফার্মগুলো।

বাংলা কিউআরে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেন চালু

বিনিয়োগে স্থবিরতা: অতিরিক্ত তারল্যের চাপে ১০ ব্যাংক

ব্যাংক খাত বিলুপ্তির মুখে, অর্থনীতি এবার নদীতে পড়তে পারে

সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা

আরব আমিরাতের কার্যক্রম চালু রাখতে মরিয়া জনতা ব্যাংক

একনেক বৈঠক স্থগিত, আটকে গেল ১৫ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট অবশেষে সচল

প্যাকেজিংয়ের ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বিশ্ববাজার ধরতে দক্ষ জনবল তৈরির তাগিদ

জরুরি নিরাপত্তা ইস্যুতে বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

বাংলাদেশে চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি বাড়লে উভয় পক্ষই লাভবান হবে: আশিক চৌধুরী