থমকে আছে নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা ফার্মের একক তালিকাভুক্তির (সিঙ্গেল পয়েন্ট এনলিস্টমেন্ট) উদ্যোগ। চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে এটি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও এর মধ্যে ছয় মাস পেরিয়েছে তবুও এটি আলোর মুখ দেখেনি। মূলত বীমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং এনজিও ব্যুরোর কাছ থেকে নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা ফার্মের বিশেষ যোগ্যতার শর্তের বিষয়ে কোনো ধরনের সুপারিশ না পাওয়ার কারণে এটি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না বলে এফআরসি (ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল) সূত্রে জানা গেছে।
এ দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শর্তের বিষয়টি সুপারিশ আকারে পাঠানোর জন্য নতুন করে তাগাদা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন এফআরসির চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। তাদের কাছ থেকে সুপারিশ পাওয়ার পর সিঙ্গেল পয়েন্ট এনলিস্টমেন্ট বাস্তবায়নে আদেশ জারি করা হবে বলে তিনি বলেন।
নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা ফার্মের একক তালিকাভুক্তির প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জানতে চাইলে এফআরসি চেয়ারম্যান আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এফআরসি ছাড়াও অন্যান্য আর্থিক নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানে তালিকাভুক্ত হতে হয়। এতে করে নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই ধরনের ডকুমেন্ট জমা দিতে হয়। আবার তালিকাভুক্তির পর বছর বছর নবায়নের জন্য ফি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ কারণে তাদের নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। এছাড়া তাতে তাদের ব্যবস্থাপনা ব্যয়ও বেড়ে যায়। এ ধরনের সমস্যা এড়ানোর জন্য নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা ফার্মের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এফআরসিতে সিঙ্গেল পয়েন্ট এনলিস্টমেন্টের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে তাদের আর অন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোয় আলাদা আলাদা তালিকাভুক্তির প্রয়োজন হবে না। এতে তাদের সময় ও ব্যয় সাশ্রয় হবে বলে এফআরসি চেয়ারম্যান বলেন।
জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সব নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা ফার্মের তালিকাভুক্তি শুধু এফআরসির অধীন সিঙ্গেল পয়েন্ট এনলিস্টমেন্টের মাধ্যমে পরিচালনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এফআরসিকে শক্তিশালীকরণ এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাঠামোগত ও সমন্বিত সহযোগিতা নিশ্চিতকরণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম সভায় ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে সিঙ্গেল পয়েন্ট বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সভায় এফআরসি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ ব্যাংক, বীমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আইআরডিএ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ), এনজিও ব্যুরো, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি), ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) প্রতিনিধি অংশ নেন।
ওই বৈঠকে বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিরীক্ষার ক্ষেত্রে নিরীক্ষককে অবশ্যই বিএসইসির তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ বিষয়ে কমিশনের সভায় আলোচনার মাধ্যমে কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি জানান, সিঙ্গেল পয়েন্ট এনলিস্টমেন্টের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ডের অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া আইডিআরএর তৎকালীন চেয়ারম্যান জানান, স্পেশাল অডিট ও কিছু নির্দিষ্ট কার্যবিধির ভিত্তিতে নিরীক্ষকদের আইডিআরএর অধীনে তালিকাভুক্ত হতে হয়।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে এফআরসির চেয়ারম্যান বলেন, নিরীক্ষকদের তালিকাভুক্তির জন্য প্রযোজ্য শর্তাবলির তালিকা এফআরসির পক্ষ থেকে সব নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পাঠানো হবে। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো তাদের নিজস্ব তালিকাভুক্তির শর্তাবলি পাঠানো হলে তার আলোকে এফআরসির অধীনে সিঙ্গেল পয়েন্ট তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হবে। বৈঠকে এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে একমত পোষণ করা হয় এবং ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। এটি বাস্তবায়নে লিড এজেন্সি হিসেবে এফআরসি কাজ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
সে সিদ্ধান্তের আলোকে নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা ফার্মের জন্য তালিকাভুক্তির অতিরিক্ত যেসব শর্ত রয়েছে সেসব শর্ত এফআরসিতে পাঠানোর জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়। এসব সংস্থার মধ্যে বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে তালিকাভুক্তির শর্তের বিষয়টি এফআরসিকে জানিয়েছে। এমআরএর পক্ষ থেকে তালিকাভুক্তির জন্য এফআরসির শর্তের অতিরিক্ত কোনো শর্তের প্রয়োজন নেই বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু এনজিও ব্যুরো এবং আইডিআরের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত কোনো কিছু জানানো হয়নি।
চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি এফআরসির চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের পর ২৯ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফায় আইডিআরএ ও এনজিও ব্যুরোকে নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা ফার্মের অতিরিক্ত শর্তের বিষয়টি জানানোর জন্য এফআরসির পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু সে চিঠির আলোকে শর্তের বিষয়ে এ দুটি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ কারণে সিঙ্গেল পয়েন্ট বাস্তবায়নের বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা ফার্মের (চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও কস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট) এফআরসিসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে পৃথকভাবে তালিকাভুক্ত হতে হয়। এতে অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার ক্ষেত্রে একই তথ্য ও দলিলাদি জমা দিতে হয়। ভিন্ন ভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে তালিকাভুক্তিতে একজন নিরীক্ষককে মোট ৩৩টি শর্ত এবং ৪৮টি ডকুমেন্ট জমা দিতে হয়। এ ধরনের সমস্যা সমাধানে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার অধীনে তালিকাভুক্তির পরিবর্তে শুধু এফআরসির অধীনে সিঙ্গেল পয়েন্ট এনলিস্টমেন্টের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।