সাক্ষাৎকারে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈনুল কবীর
চতুর্থ প্রজন্মের সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি) ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল। আগামী ৩ এপ্রিল ব্যাংকটি ১৩ বছর পূর্ণ করবে। বর্তমানে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এস এম মঈনুল কবীর। এসবিএসি ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আমার দেশ-এর সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
আমার দেশ : ব্যাংকের ১৩ বছরের পথচলায় বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাই।
মঈনুল কবীর : বর্তমানে ব্যাংকটি ৯০টি শাখা, ৩২টি উপশাখা, এজেন্ট আউটলেট ও ৭৭টি এটিএম বুথের মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছে। প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ব্যাংকটির ১০টি শাখার মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকিং সেবাও নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্যে অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের অর্থায়ন করা হচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংকের মোট আমানত প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ৯ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) ৮২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার মধ্যেই রয়েছে। এ সময় ব্যাংকের মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৮২৪ কোটি টাকা। ব্যাসেল-৩ অনুসারে প্রয়োজনের চেয়েও উদ্বৃত্ত মূলধন থাকায় মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) ১৪ দশমিক ২২ শতাংশ, যা ব্যাংকটির শক্তিশালী আর্থিক ভিতের প্রমাণ বহন করে।
আমার দেশ : ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বড় সমস্যা। আপনাদের ব্যাংকের অবস্থা কী?
মঈনুল কবীর : কোভিড পরিস্থিতি এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো ব্যাংকিং খাতের মতো আমাদের খেলাপি ঋণ কিছুটা বেড়েছে। তবে আমরা গ্রাহকদের নীতিগত সহায়তা করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা পুনরায় সচল করার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছি।
আমার দেশ : বর্তমানে সবকিছু ডিজিটালাইজেশনের ওপর নির্ভরশীল। এ ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থান কী?
মঈনুল কবীর : আমরা বর্তমানে ডিজিটালাইজেশনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি, যাতে একজন গ্রাহক ঘরে বসেই তার স্কুলের ফি, বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারেন। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ক্যাশলেস’ ভিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করছি। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে গ্রাহকদেরও সচেতন হতে হবে—বিশেষ করে ওটিপি শেয়ার করা বা সন্দেহজনক লিংকে প্রবেশের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। আমাদের সিস্টেম সুরক্ষিত, কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত প্রয়োজন।
আমার দেশ : এসবিএসি ব্যাংক ঋণ বিতরণে কোন খাতকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে?
মঈনুল কবীর : আমরা বর্তমানে বড় ঋণের তুলনায় সিএমএসএমই এবং অ্যাগ্রোভিত্তিক শিল্প খাতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের মোট ঋণ বিতরণের প্রায় ৩৮ শতাংশ বর্তমানে এসএমই খাতে। আমরা এটি বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য এমএফআই লিংকেজ এবং তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে কাজ করছি। পাশাপাশি ভালো করপোরেট ঋণও দেওয়া হবে। তবে তা যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে, যাতে ঋণ খেলাপি না হয়।
আমার দেশ : ব্যাংকের বর্তমান বোর্ড কি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিচ্ছে?
মঈনুল কবীর : আমি গত ১৭ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমাদের বোর্ডে স্বনামধন্য ব্যবসায়ী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কস্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রয়েছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বোর্ডকে ম্যানেজমেন্টের কাজে বা ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে দেখিনি। তারা আমাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিচ্ছেন।
আমার দেশ : নানা কারণে ব্যাংক খাত আস্থার সংকটে রয়েছে। গ্রাহকের আস্থা বাড়াতে কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন?
মঈনুল কবীর : গ্রাহকের আস্থা বাড়াতে আমরা নিয়মিত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। আমাদের ব্যাংকে ৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো গ্রাহক চেক জমা দিয়ে টাকা পাননি এমন কোনো নজির নেই। বরং এ সময় আমাদের কাস্টমার ডিপোজিট প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। যদিও একই সময়ে করপোরেট ডিপোজিট কিছুটা কমেছে।
আমার দেশ : ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু বলুন।
মঈনুল কবীর : আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ব্যাংকটিকে একটি শক্তিশালী ও জনগণের ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। আগামী তিন বছরের মধ্যে এসবিএসিকে দেশের সেরা ২০-২৫টি ব্যাংকের তালিকায় নিয়ে যেতে চাই। আমরা শুধু করপোরেট খাতের ওপর নির্ভর না করে সাধারণ গ্রাহক এবং এসএমই খাতে বিনিয়োগ ও সেবা আরো বিস্তৃত করতে চাই।
আমার দেশ : যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের রেমিট্যান্সে কোনো প্রভাব পড়বে কি?
মঈনুল কবীর : যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রেমিট্যান্স নিয়ে কিছুটা শঙ্কা রয়েছে। কারণ যারা ছুটিতে দেশে এসেছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই এখন প্রবাসে ফিরে যেতে পারছেন না, নতুন করে জনশক্তি রপ্তানিও কমেছে। ফলে সাময়িকভাবে কিছু চাপ তৈরি হতে পারে।