প্রথমবারের মতো বড় ধরনের তদন্তের মুখে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। ডিএসইর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ নিয়োগ ও পদোন্নতি, ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে শেয়ার ব্যবসা, বেনামে স্টেকহোল্ডার ক্রয়, মহিলা সহকর্মীদের প্রলোভন দেখিয়ে যৌন হয়রানি, নিকুঞ্জে ভবন নির্মাণ থেকে অর্থ উপার্জন, মূল্য সংবেদনশীল তথ্য গোপন করে শেয়ার ব্যবসা পরিচালন, ম্যাচিং ইঞ্জিনের দায়িত্বে থেকে অর্থের বিনিময়ে বিনিয়োগকারীদের গোপনীয় পোর্টফোলিও তথ্য পাচার, নিয়মবহির্ভূতভাবে ২৮ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে।
ডিএসইর এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি খুঁজতে মাঠে নেমেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ জন্য ডিএসইর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অব্যবস্থাপনা, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি, নিয়োগে অনিয়ম এবং স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ অনুসন্ধান ও কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে দুটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিএসইসি।
জানা গেছে, ইতোমধ্যে তদন্তের অংশ হিসেবে গঠিত কমিটির সদস্যরা ডিএসইর সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে কমিটি। ২৩ আগস্টের মধ্যে এসব তথ্য পাঠানোর জন্য বলা হয়। এ হিসাবে কমিটির কাছে তথ্য পাঠানোর শেষ দিন আজ।
জানতে চাইলে ডিএসইর এমডি নুজহাত আনোয়ার আমার দেশকে বলেন, বিএসইসির পক্ষ থেকে যে ধরনের তথ্য ও ডকুমেন্ট চাওয়া হয়েছে, তা প্রস্তুত করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেগুলো জমা দেওয়া হবে।
ডিএসইর সাবেক চেয়ারম্যান আহমেদ ইকবাল হাসান আমার দেশকে বলেন, ডিএসইতে সুশাসন বলে কিছু আছে বলে মনে হয় না। করপোরেট গভর্ন্যান্সের ন্যূনতম বালাই নেই। তিনি আরো বলেন, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশের এই ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটিকে কুক্ষিগত করে চালানো হচ্ছে। এতে বারবার বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এবারই প্রথম বিএসইসি এ ধরনের তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি শেয়ারবাজারের জন্য খুবই ইতিবাচক ঘটনা।
জানা গেছে, ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের বাজার ধস, বেশ কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসের মালিকদের সিসিএ থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কয়েকশ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ডিএসইর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ডিএসইর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা, মহাব্যবস্থাপক ও অন্যান্য কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের শেয়ার ব্যবসা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়োগ/চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম, রেগুলেটরি এফেয়ার্স ডিভিশন, নমিনেশন অ্যান্ড রিমিউনারেশন কমিটি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভূমিকা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।
এসব অনিয়ম ও অভিযোগের তদন্তে গত ১০ আগস্ট তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিএসইসি। তদন্ত কমিটি ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরের ডিএসইর নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, ব্যবস্থাপনা চিঠি এবং অভ্যন্তরীণ ও বহিঃনিরীক্ষা প্রতিবেদন চেয়েছে। এছাড়া, জানুয়ারি ২০২০ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ডিএসইর সব পরিচালনা পর্ষদ সভার কার্যবিবরণী চাওয়া হয়েছে। পাঁচ বছর আগের ও বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো এবং এ সময় কোনো পরিবর্তন হয়ে থাকলে তার বিবরণও দিতে বলা হয়েছে।
বিএসইসি তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে ডিএসইকে অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সব নথি ও ই-মেইল যোগাযোগ সংরক্ষণের নির্দেশও দিয়েছে। অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব রেকর্ড পরিবর্তন, মুছে ফেলা বা ওভাররাইট না করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো অনুসন্ধান ও তথ্য চাওয়ার বিষয়টি কঠোরভাবে গোপন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত কমিটির চিঠিতে, জানুয়ারি ২০২৪ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সহকারী মহাব্যবস্থাপক ও তার ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সব নিয়োগ এবং চুক্তিভিত্তিক ও পরামর্শক নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ নথি চাওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, প্রাপ্ত আবেদন, সাক্ষাৎকার বোর্ডের গঠন, মূল্যায়ন বা মেধা তালিকা এবং অনুমোদন নোট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া গত তিন বছরে ডিএসইর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের করপোরেট সুশাসন, নিয়োগ ও মানবসম্পদ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনও চেয়েছে তদন্ত কমিটি।
ডিএসইর আরএসি, আরএডি এবং মনোনয়ন ও পারিশ্রমিক কমিটির কার্যপরিধি, বর্তমান সদস্যদের তালিকা এবং জানুয়ারি ২০২৪ থেকে এসব কমিটির সভার কার্যবিবরণী ও সিদ্ধান্তও চাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে চুক্তিভিত্তিক পদ, পরামর্শক ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগসংক্রান্ত নথি চেয়েছে বিএসইসি।