চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) কমোডিটি মার্কেট চালুর জট অবশেষে খুলতে যাচ্ছে। চলতি মাসেই কমোডিটি মার্কেটের জন্য ব্রোকারেজ হাউসের নিবন্ধন দেওয়া হচ্ছে। সিএসইর কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবিজি লিমিটেডের অতিরিক্ত শেয়ার ‘ব্লক’ থাকবে। একই সঙ্গে কমোডিটি মার্কেটে হেজার ক্যাটাগরির অনুমোদন দেওয়ার বিষয়েও আসছে সিদ্ধান্ত। হেজার ক্যাটাগরিতে থাকবে বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, রিফাইনারি কিংবা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর মধ্য থেকেই ‘মার্কেট মেকারের’ লাইসেন্স দেওয়া হবে। তবে কমোডিটি মার্কেট খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কমোডিটি মার্কেট চালুতে শতভাগ প্রস্তুতি অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে—এমনটি দাবি করে আসছে সিএসই। তারা বলেন, ব্রোকারেজ হাউসসহ পণ্যের অনুমোদনে আবেদন জানিয়ে এলেও বিএসইসির পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। এ কারণে তারা কমোডিটি মার্কেট চালু করতে পারেনি।
গত জুন মাসে খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ চার কমিশনার পদত্যাগ করার পর বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে করপোরেট ব্যক্তিত্ব মাসুদ খানকে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় বিএনপি সরকার। চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নিয়ে কমোডিটি মার্কেট চালুর বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। গত ৩১ ডিসেম্বর ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) আয়োজিত আলোচনায় অংশ নিয়ে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর বিষয়ে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার কথা জানান মাসুদ খান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে যেসব সমস্যা ছিল সেগুলো ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্রোকার নিবন্ধন ও পণ্য অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দেওয়ার কাজ চলছে। আগামী এক বছরের মধ্যে পুরো সিস্টেমটি চালু হবে এবং চট্টগ্রামে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ কার্যক্রম শুরু করতে পারবে বলে জানান তিনি।
কমোডিটি মার্কেট চালুর বিষয়ে সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান মজুমদার আমার দেশকে বলেন, কমোডিটি মার্কেট চালুর জন্য আমাদের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে। ব্রোকার ও পণ্যের অনুমোদনের জন্য আমরা এক বছর আগে বিএসইসিতে আবেদন জমা দিয়েছি কিন্তু তা পাওয়া যায়নি। বিএসইসির কাছ থেকে অনুমোদন পাওয়ার দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে কমোডিটি মার্কেট চালু সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। ব্রোকারেজ হাউসের অধীনে মার্কেট মেকার চালুর বিষয়ে একটি স্কিম নেওয়া হয়ে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন মার্কেটে যারা পার্টিসিপেন্ট হবে তাদের সচেতন করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, সিএসইর কমোডিটি মার্কেটের ব্রোকার হিসেবে নিবন্ধন পেতে সাতটি ব্রোকারেজ হাউস আবেদন করেছে। ব্রোকারেজ হাউসগুলো হলো—লংকাবাংলা, বি-রিচ, সোহেল সিকিউরিটিজ, আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ, রয়্যাল ক্যাপিটাল, ইউসিবি স্টক ব্রেকারেজ ও এনএলআই সিকিউরিটিজ। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণসাপেক্ষে চলতি মাসেই ব্রোকার হিসেবে অনুমোদনে ছাড়পত্র দেওয়া হবে। যেহেতু কমোডিটি মার্কেট খুবই স্পেকুলেটিভ সেজন্য এটিকে খুব বড় করা হবে না এবং ৭ থেকে ১২টি ব্রোকারেজ হাউসকে ব্রোকার নিবন্ধন দেওয়া হবে। যারা ব্রোকার নিবন্ধন পাবে তাদের মধ্য থেকেই মার্কেটে মেকারের নিবন্ধন দেওয়া হবে বলে জানান বিএসইসির কর্মকর্তারা। যদিও ব্রোকার ও মার্কেট মেকারের দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানকে ব্রোকার ও মার্কেট মেকারের নিবন্ধন দেওয়া হলে স্বার্থের সংঘাত তৈরির একটা আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে কমোডিটি মার্কেটের পণ্য হিসেবে প্রথম পর্যায়ে স্বর্ণ, রুপা ও তামার অনুমোদন দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধাতব মুদ্রা দিয়েই শুরু হবে সিএসইর কমোডিটি মার্কেট। পরবর্তী ধাপে ক্রুড অয়েল, পাম অয়েল ও তুলা পণ্য তালিকায় যুক্ত হবে।
বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি (বাজুস)। তবে কমোডিটি মার্কেটে রেফারেন্স ভ্যালু হিসেবে শিকাগো, লন্ডন বুলিয়ান কিংবা দুবাই মার্কেটের যেকোনো একটিকে অনুসরণ করা হবে। আলোচনার ভিত্তিতে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অবশ্য সিএসইর কমোডিটি মার্কেট চালুর বিষয়ে শেয়ার ধারণ-সংক্রান্ত একটি জটিলতা রয়েছে। বিএসইসি ২০২৪ সালের মার্চে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে (সিএসই) কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর লাইসেন্স দেয়। তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছিল যে, কোনো কৌশলগত বিনিয়োগকারী বা তাদের কোনো অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের যদি এমন কোনো ব্রোকারেজ হাউসে শেয়ার বা মালিকানা থাকে যার আবার সিএসইর নিজস্ব মালিকানায় অংশীদারিত্ব রয়েছে, তবে স্বার্থের সংঘাত এড়াতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই ব্রোকারেজ হাউসের শেয়ার বা মালিকানা ছাড়তে হবে। ২০২২ সালে বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবিজি লিমিটেড ২৫ শতাংশ শেয়ার কিনে সিএসইসির কৌশলগত অংশীদার হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এবিজির একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান—স্টক অ্যান্ড সিকিউরিটি লিংকওয়ে লিমিটেড নামে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের একটি ব্রোকারেজ হাউসের মালিকানা কিনে নেয়। মালিকানা কিনতে স্টক অ্যান্ড লিংক ওয়ে সিএসইসির ০.৫১ শতাংশ শেয়ার ধারণ করে। কমোডিটি মার্কেট চালুতে এ শর্ত একটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। মার্চে ওই অনুমোদন পাওয়ার পর স্টক অ্যান্ড সিকিউরিটি লিংকওয়ের শেয়ার হস্তান্তরে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও সরকার পতনের কারণে সেটি আর সম্ভব হয়নি। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন সব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হস্তান্তরে এনবিআরের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং এখনো এ নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। ফলে শেয়ার ধারণে আইনি জটিলতা নিরসনে স্টক অ্যান্ড লিংক ওয়ের ধারণকৃত শেয়ার ‘ব্লক’ রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে এনবিআর থেকে শেয়ার হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে স্টক অ্যান্ড লিংক ওয়ের মালিকানা ছাড়তে হবে এবিজিকে। অবশ্য শেয়ার ব্লক থাকাকালীন যদি কোনো নগদ লভ্যাংশ পাওয়া যায় সেটি পেতে কোনো বাধা হবে না। কিন্তু বোনাস লভ্যাংশ দেওয়া হলে সেটিও ব্লক থাকবে।