মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত
বিনিয়োগ মন্দা, কর্মসংস্থান সংকট, রাজস্ব আয়ে ঘাটতি, রপ্তানি আয়ে ভাটার কারণে দেশের অর্থনীতিতে নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে ইরানের ওপর আমেরিকা-ইসরাইলের যৌথ হামলার কারণে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
অন্যদিকে হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান তার প্রতিবেশী দেশ আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এখন অনিরাপদ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে রয়েছে। দ্রুত এ পরিস্থিতির অবসান না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গভীর সংকট তৈরির আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
এ অবস্থায় কৃচ্ছ্রসাধন এবং বিকল্প জ্বালানির উৎস খোঁজার পরামর্শ তাদের। তারা বলছেন, সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করতে হবে। প্রয়োজনে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে চলতি অর্থবছরের বাজেট পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি তেল ও এলএনজি গ্যাসের চাহিদা মেটাতে প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আসে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে। অন্যদিকে এলএনজির ৪০ শতাংশই আসে কাতার থেকে। কিন্তু ইরানের ড্রোন হামলার পর দেশটির কাতার এনার্জির উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করেছে দেশটি। ফলে বিশ্ব বাজারে এলএনজির দরও বাড়ছে হুহু করে। জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহের অন্যতম সমুদ্রপথ হচ্ছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে ওমান উপসাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে বাংলাদেশে জাহাজ আসে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করায় সংকট আরো তীব্র হয়ে উঠবে।
এদিকে ইরানে হামলার ঘটনায় দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ নেতারা নিহতের ঘটনায় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলার ঘটনায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এখন যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফলে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ অবস্থা বিরাজ করলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের চাকরির বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। শ্রমিক ছাঁটাই কিংবা তুলনামূলক কম বেতনে কাজ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে দেশগুলোতে নতুন করে শ্রমবাজার সংকুচিত হতে পারে। এতে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে দেশের অর্থনীতির যতটুকু স্বস্তি বিরাজ করছে, তার বড় কারণ প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এসব দেশে প্রায় ১০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছে। গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল সাড়ে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে রিজার্ভের পরিমাণ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। তবে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভ পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় ফিরলেও এখনো এটি সন্তোষজনক অবস্থায় নেই। এর মধ্যে বাড়তি দামে জ্বালানি তেল কিনতে হলে রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে। এতে দেশের আমদানি ও বৈদেশিক বাণিজ্য ভারসাম্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী এম মাসরুর রিয়াজ আমার দেশকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশই আসে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। অন্যদিকে এলএনজির প্রায় ৫০ শতাংশই আসে কাতার ও ওমান থেকে। এখন হামলার কারণে জ্বালানি তেলের উৎস হিসেবে যেসব শিল্প রয়েছে, সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিও বন্ধ। একদিকে উৎপাদন, অন্যদিকে সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম বেড়েই চলছে। এখন বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনতে হলে রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।
জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ঠিক না থাকলে প্রথমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, এরপর কল-কারখানার উৎপাদন এমনকি যানবাহন চলাচলও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে এ পরিস্থিতিতে সরকারকে জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রতাসাধন করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করতে হবে। জ্বালানি তেলের বিকল্প উৎস হিসেবে মালয়েশিয়া, ব্রুনাইয়ের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনে কিছু বুকিং দিয়ে রাখা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিক ইসলাম খান আমার দেশকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যে সংকট তৈরি হয়েছে তার সমাধান আমাদের হাতে নেই। আগামী ৭-১০ দিনের মধ্যে যদি পরিস্থিতির উত্তরণ না ঘটে তাহলে আমাদের জন্য সংকটময় হয়ে উঠবে। তবে সেটি নির্ভর করবে পরিস্থিতির গভীরতা ও সময়ের ব্যাপ্তির ওপর। এক্ষেত্রে আমাদের আশু কিছু করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। এর মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেল রিজার্ভ বাড়াতে হবে। এছাড়া বিদ্যুৎ আমদানি বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারকে গুরুত্বারোপ করতে হবে। আগামী বোরো ফলন যাতে ঠিকমতো হয়, সেটি সরকারকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। সরকারের যেসব নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রয়েছে সেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেয়ে সংকট মোকাবিলার বিষয়টি অধিক গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে জানিয়ে এ বিশ্লেষক বলেন, প্রয়োজনবোধে কৃচ্ছ্রতাসাধন করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানিতেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। সুয়েজখাল ব্যবহার করে ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানির রুটটিও এখন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে। এখন বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানিতে বিকল্প পথ ব্যবহারের প্রয়োজন হলে এতে সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়ে যাবে। এতে পোশাক রপ্তানি আয় কমে যাবে। এছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে উত্তর ইউরোপ ও আমেরিকা অঞ্চলের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। এতে তাদের চাহিদাও কমবে। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি গভীর সংকটে পড়তে পারে।