বিশ্বে যখনই যুদ্ধ বা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দেয় তখনই বেড়ে যায় স্বর্ণের দাম। কারণ বিনিয়োগকারীরা মুদ্রাস্ফীতির বিপরীতে স্বর্ণেকে বিনিয়োগের সবচেয়ে নিরাপদ বস্তু হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ চললেও এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গত ২৮ জানুয়ারি প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম উঠেছিল ৫ হাজার ৩০৩ ডলারে, যা গত ১২ জুন ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে নেমে আসে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমাবে না-এমন শঙ্কার কারণেই মূলত স্বর্ণের দাম চাপের মুখে পড়েছে। এমনকি দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাংকগুলো সুদের হার আরো বাড়াতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
নেপথ্যে হরমুজ প্রণালির সংকট
বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা। যুদ্ধের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান এই সমুদ্রপথ দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে রেখেছে। তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রধান এই ধমনীটি বন্ধ থাকায় জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ৪.২ শতাংশ রয়েছে। একই সময়ে দেশটির শ্রমবাজারও স্থিতিশীল থাকায় অবিলম্বে সুদের হার কমার সম্ভাবনা ভেস্তে গেছে। স্বর্ণ যদিও মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে, তবে উচ্চ সুদের হার এর মূল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্বর্ণকে একটি লভ্যাংশহীন সম্পদ ধরা হয়, কারণ নিজস্ব মূল্য বৃদ্ধি ছাড়া এটি থেকে অতিরিক্ত কোনো আয় আসে না।
আর্থিক বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘অপশনস্প্রেডার্স ডটকম’-এর প্রধান অপশন অ্যানালিস্ট জাস্টিন কার্ডওয়েল আল জাজিরাকে বলেন, ‘সম্পদের দিক থেকে স্বর্ণ প্রায় আসল অর্থের কাছাকাছি। এটি কোনো ডিভিডেন্ড সংগ্রহ করে না, আবার দাম না বাড়া পর্যন্ত এর কোনো বাড়তি মূল্যও পাওয়া যায় না। মানুষ মূলত এর মূল্যবৃদ্ধির আশাতেই স্বর্ণ কেনে।’
ডলারের শক্তি বনাম স্বর্ণের বাজার
সুদের হারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সরাসরি স্বর্ণের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কার্ডওয়েল জানান, সুদের হার উচ্চ থাকলে মানুষ ডলারের দিকে ঝুঁকে পড়ে, ফলে বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ তার আকর্ষণ হারায়। ইরান সংঘাত ডলারের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। আর স্বর্ণ যেহেতু ডলারে মূল্যায়িত হয়, তাই ডলারের শক্তি বাড়লে স্বর্ণের দাম কমে।
নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টস-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কলিন প্লাম আল জাজিরাকে এক ইমেইলে বলেন, ‘যখন ডলার শক্তিশালী হয়, তখন স্বর্ণ চাপের মুখে পড়ে, আবার ডলার দুর্বল হলে স্বর্ণের দাম বাড়তে থাকে। এই মুহূর্তে ডলার শক্তিশালী, যার প্রভাব স্বর্ণ টের পাচ্ছে।’
তবে উভয়ের ভবিষ্যৎ মূল্য এখনো অনিশ্চিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইরান যুদ্ধের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার নাটকীয়ভাবে কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। তবে ‘সিএমই ফেডওয়াচ’ টুলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার আরো বৃদ্ধির সম্ভাবনা এখন ৫০ শতাংশের বেশি।
কলিন প্লামের মতে, ‘সুদের হার এবং মুদ্রাস্ফীতি হলো দোলনার দুই দিক, আর স্বর্ণ এর ঠিক মাঝখানে অবস্থান করছে। ২০২৬ সালের জটিলতা হলো দুটি ব্যবস্থাপনাই একসঙ্গে ঘটছে, এবং বর্তমানে সুদের হারের দিকটিই জয়ী হচ্ছে। এই কারণেই স্বর্ণ বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।’
চুক্তির খবরে সামান্য স্বস্তি
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য একটি চুক্তির খবর আসার পর স্বর্ণের দাম আগের দিনের তুলনায় সামান্য বেশি দামে বন্ধ হয়েছে। কার্ডওয়েল বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনার খবর স্বর্ণের জন্য ইতিবাচক হতে পারে, কারণ তখন ধরে নেওয়া হবে যে মুদ্রাস্ফীতি কমে আসবে।’
তবে এই প্রক্রিয়াটি কার্যকর হতে এখনও বেশ কয়েক মাস সময় লাগবে।
কার্ডওয়েল আরো বলেন, বর্তমানে স্বর্ণ যে স্তরে রয়েছে, তা একটি সহায়তাকর স্থান হতে পারে। তবে যুদ্ধ শেষ হলেও আরো অনেক বিষয় থাকবে যা স্বর্ণের দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এএম