হোম > বাণিজ্য > অর্থনীতি

ব্যাংক খাত সংস্কার কমিশনের আওতায় আনা হবে

ইআরএফের সেমিনারে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ‘ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, পরিবর্তন ও মেরামত আমরা কমিশনের মধ্যে আনব। কারণ এটা ছাড়া কীভাবে করব? এটা ছাড়া তো করার কোনো পথ নাই। আমি যদি গণমাধ্যম সংস্কার, দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে কমিশন ও প্রশাসনে সংস্কারের কথা বলতে পারি, তাহলে ব্যাংকিং খাতের মতো এরকম গুরুত্বপূর্ণ খাত কেন সংস্কার করব না? আমরা এটা করবই।’

রোববার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত 'ব্যাংক খাতে সুশাসন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা' শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি ওবায়দুল্লাহ রনি ও প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার সানাউল্লাহ সাকিব।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্র যদি সামগ্রিক সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে কেবল গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে এই খাতে শৃঙ্খলা আসবে না।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বা 'পলিটিক্যাল রেটরিক' হিসেবে ব্যবহারের জন্য তথ্য ম্যানিপুলেশন বা জালিয়াতি করা হয়েছিল বিগত আমলে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ছিল, যেখানে শাসকগোষ্ঠী নিজেদের প্রয়োজনে পরিসংখ্যান পরিবর্তন করে দিনের বেলাকে রাত আর রাতকে দিন হিসেবে প্রচার করেছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া তথ্য বা পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যান এভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

দেশের অর্থনীতির ঐতিহাসিক বিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অর্থনীতির যে দ্বার উন্মোচন করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বেসরকারি খাতের পরিধি বেড়েছে।

পুঁজির উৎস হিসেবে তিনি কেবল ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল না থেকে শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, যারা ব্যাংকের আমানত আত্মসাৎ করেছে, সেই একই গোষ্ঠী শেয়ারবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অর্থও আত্মসাৎ করেছে।

ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামদুদুর রশীদ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক দশকে এ খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগের মুখোমুখি হয়েছে। অন্য অনেক ব্যাংকের মতো ইউসিবিও বর্তমানে আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে। এই চাপের প্রধান কারণ হলো সুশাসনের অভাব। তবে যেসব ব্যাংক সুশাসন নিশ্চিত করতে পেরেছে, তারা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘২০২০ সাল থেকে ব্যাংকিং খাত ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ধরনের চাপের সম্মুখীন হয়েছে। ২০২০ সালে করোনা মহামারির প্রভাব এবং ২০২১ সালে এর দ্বিতীয় ঢেউ ব্যাংকিং কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। ২০২২ সালে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এরপর ২০২৪ সালের শুরুতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব এবং বছরের মাঝামাঝি সময়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ব্যাংকিং খাতের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করে। আমি ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ইউসিবির দায়িত্ব গ্রহণ করি। তখন আমি সুশাসনের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত একটি প্রতিষ্ঠান পাই, যেখানে তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণের (এনপিএল) বড় সমস্যা ছিল।’

তিনি আরো বলেন, ‘সুশাসনের তিনটি মৌলিক উপাদান রয়েছে। প্রথমত, জবাবদিহি। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা—উভয়কেই জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্বচ্ছতা। ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। স্বচ্ছতার অভাবের কারণেই দীর্ঘদিন খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র গোপন ছিল। ২০২৩ সালে পুরো ব্যাংকিং খাতে রিপোর্ট করা খেলাপি ঋণের হার ছিল ১১ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে ২৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়। আমার মতে, এই বৃদ্ধি মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় প্রকৃত তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশের ফল। এটি এক বছরের অবনতির চিত্র নয়; বরং দীর্ঘদিনের বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন। তৃতীয়ত, নৈতিকতা। রাজনৈতিক প্রভাব ও বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ যখন ব্যাংক ব্যবস্থাপনার ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তখন নৈতিক স্খলন ঘটে। এর ফলে কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সম্ভব হয় না। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট ও অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ এটিই।’

মূল প্রবন্ধে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতি আজকের যে অবস্থানে এসেছে, অর্থায়নের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক খাত। এখানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অধিকাংশ অর্থায়ন আসে ব্যাংক-ব্যবস্থা থেকে। কারণ দেশের পুঁজিবাজার চাহিদামতো পুঁজি জোগান দিতে পারেনি। আর বন্ড বাজারকেও আস্থার জায়গায় নেওয়া যায়নি।

ফলে ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের সঙ্গে পুরো অর্থনীতির ভালো মন্দের বিষয়টি সম্পৃক্ত। একটি কার্যকর ও শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও নিয়মকানুনের কঠোর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। নানা কারণে দেশের ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা অনেক কমেছে। এখন কোনোভাবে যেন আরও তলানিতে না নামে, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ রাখা জরুরি।

সুশাসন নিশ্চিত করতে ও দুর্নীতি প্রতিরোধে গণমাধ্যম 'চতুর্থ স্তম্ভ' হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। যদিও যারা সরকারে থাকেন, অনেক ক্ষেত্রে তারা গণমাধ্যমের ভূমিকাকে কখনো কখনো খারাপ দৃষ্টিতে দেখেন। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা না করে তোয়াজ করে চলুক এ রকম প্রত্যাশা করেন। আর এ কারণে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের নানা চেষ্টা আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি।

এতে আরো বলা হয়েছে, দেশের ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান মানুষের জমানো টাকা সময়মতো ফেরত দিতে পারছে না। ২০১৯ সাল থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই দুরবস্থা প্রথম সামনে আসে। ২০২১ সাল থেকে কয়েকটি ব্যাংকও মানুষের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। বর্তমানে সম্মিলিত পাঁচ ইসলামি ব্যাংকসহ অন্তত ১৪টি ব্যাংক চাহিদামতো আমানত ফেরত দিতে পারছে না। কোনোভাবে এই সংখ্যা আরও বাড়লে অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনবে। আমানতকারীর আস্থা ধরে রাখার জন্য সুশাসন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান জাহিদ এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ।

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।

বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে সাধারণ মানুষ

টার্নওভার ভিত্তির পরিবর্তে আসছে সুনির্দিষ্ট ভ্যাট

খুরশীদ আলমকে অপসারণের দাবিতে গ্রাহক ফোরামের বিক্ষোভ

ঋণ পরিশোধ ও মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ

অগ্রিম আয়কর থেকে রেহাই পাচ্ছেন মোটর বাইকাররা

এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর পক্ষে জাতিসংঘ

তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা

বিশ্ববাজারে কমল জ্বালানি তেলের দাম

বিশ্ববাজারে ফের কমল তেলের দাম

আইএমএফের কাছ থেকে জরুরি ভিত্তিতে ঋণ নিচ্ছে বাংলাদেশ