চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বাস্তবায়নের এই বেহাল দশার কারণে মূল এডিপি থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা হ্রাস করা হয়েছে। যার ফলে মোট বরাদ্দ দুই লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎসে ১৬ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক সহায়তার ১৪ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে।
গতকাল সোমবার প্রধান উপদেষ্টা এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) চেয়ারপারসন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) অনুমোদিত হয়। শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ সভার সিদ্ধান্তক্রমে বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে সরকারি অর্থায়ন নেমে এসেছে এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকায়, আর বিদেশি ঋণ ও অনুদান কমে হয়েছে ৭২ হাজার কোটি টাকা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত এডিপির বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বাস্তবায়নের দিক থেকে সবচেয়ে বেহাল দশা স্বাস্থ্য খাতের। সংশোধিত এডিপিতে দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে এই খাতে বরাদ্দ প্রায় ৭৪ শতাংশ কমানো হয়েছে। মূল এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, সেখানে সংশোধনের পর কমিয়ে মাত্র চার হাজার ৭১৮ কোটি টাকা করা হয়েছে। এ বছরের এডিপিতে দুই বিভাগ মিলে স্বাস্থ্য খাতে ২৯টি প্রকল্প রয়েছে । কয়েক বছর ধরে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকার পরও এডিপি বাস্তবায়নে পিছিয়ে এই সংস্থা।
স্বাস্থ্য খাত ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধিকাংশ প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হয়েছে, এর মধ্যে শিক্ষা খাতে বড় ধরনের কাটছাঁট করে প্রায় ৩৫ শতাংশ বরাদ্দ কমিয়ে ১৮ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা করা হয়েছে। পরিবহন ও যোগাযোগ খাত মূল এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেলেও সংশোধিত এডিপিতে প্রায় ৩৫ শতাংশ অর্থের হ্রাস পেয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতেও বরাদ্দ কমেছে। মূল এডিপিতে থাকা দুই হাজার ১৮ কোটি টাকা থেকে সংশোধনের পর কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৪৫ কোটি টাকায়। বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ১৯ শতাংশ, আর কৃষি খাতে কমেছে ২১ শতাংশ। সংশোধিত এডিপিতে ব্যতিক্রম কেবল পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি সম্পদ খাত। এই খাতে বরাদ্দ ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
গতকালের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) আওতায় মোট প্রকল্প সংখ্যা এক হাজার ৩৩০টি, যা মূল এডিপিতে ছিল এক হাজার ১৭৩টি। এর মধ্যে নতুনভাবে অনুমোদিত প্রকল্প রয়েছে ১৩৮টি, যার মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প এক হাজার ১০৮টি, সম্ভাব্যতা যাচাই ৩৫টি, কারিগরি সহায়তায় ১২১টি এবং সংস্থা নিজস্ব অর্থায়নে ৬৬টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। খাতভিত্তিক বরাদ্দে পরিবহন যোগাযোগ, বিদ্যুৎ জ্বালানি, গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা, শিক্ষা এবং স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন অগ্রাধিকার পেয়েছে। এসব খাতে মোট বরাদ্দ এক লাখ ২১ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা, যা সামগ্রিক কর্মসূচির ৬০ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে, যা মোট আরএডিপির ১৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ দ্বিতীয় ১৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা এবং বিদ্যুৎ বিভাগ তৃতীয় ১৪ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা। এছাড়া শীর্ষ বরাদ্দের তালিকায় রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১২ হাজার ২৯ কোটি টাকা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ১০ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আট হাজার ৫৪ কোটি টাকা।
আরএডিপি সভা শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, আজ (গতকাল) বড় সভা হলো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোনটা কোন খাতে ব্যয় হবে, তা চূড়ান্ত হলো। নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য নতুন প্রকল্প সবুজপাতায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তিনি আরো বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি রয়েছে। আমাদের আশা ছিল এর কিছু উন্নতি হবে তবে বিভিন্ন কারণে সম্ভব হয়নি। অনেক প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প পরিচালক নেই। এখন তেমন কেউ পরিচালক হতেও চায় না। এছাড়া আমরা এখন প্রকল্প পেতে স্বচ্ছতার জন্য নতুন কিছু শর্ত দিয়ে দিচ্ছি। এসব শর্ত পালনে হয়তো তাদের সময় বেশি লেগে যাওয়ায় বাস্তবায়নে যথেষ্ট অগ্রগতি হচ্ছে না।