পণ্য খালাসে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তারা বলেন, ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করলে আপনি (এনবিআর) যা (রাজস্ব) চাইবেন তা-ই দেব। কোনো কিছু কমানোর কথা বলব না।
গতকাল রোববার রাজধানীর রাজস্ব ভবনে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ টেরি টাওয়েল অ্যান্ড লিলেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম শাহদাত হোসেন বলেন, পণ্য খালাসে ব্যবসায়ীদের নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। এসব হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ভ্যাট অডিট, বন্ডের অডিট, টেক্সের অডিট নামে ব্যবসায়ীরা অডিটের যন্ত্রণায় রয়েছেন।
আলোচনায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএ, বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনসহ বেশ কয়েকটি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এছাড়া বিডা, বেপজা, বেজার প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। এতে সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে পণ্য রপ্তানির বিভিন্ন স্যাম্পলের ওপর থেকে ভ্যাট ও ট্যাক্স প্রত্যাহারের আবেদন জানানো হয়। বিজিএমইএ বন্ডের মাধ্যমে স্যাম্পল পণ্যের ক্ষেত্রে ভ্যাট, ট্যাক্সের সুবিধা পেলেও বায়িং হাউসগুলো এ সুবিধা পাচ্ছে না।
জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা ব্যবসায় প্রক্রিয়াগুলো সহজ করতে চাই। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে যেসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপক অপব্যবহার হয়েছে। এ জন্য আমরা নতুন কোনো অ্যাভিনিউ খুলতে চাই না। যখনই নতুন কোনো সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তখনই তার অপব্যবহার হয়েছে। তিনি বন্ডের অপব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, এ খাতে যে পরিমাণ অপব্যবহার হয়েছে, তা প্রকাশ করা হলে তাজ্জব হতে হবে। বন্ডের অপব্যবহারের কারণে দেশের অনেক শিল্প গড়ে উঠতে পারেনি।
ব্যবসা সহজ করতে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আমরা এর জন্য আইনকানুন বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনব। তবে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সব ধরনের লিকেজ বন্ধের বিষয়ে নিশ্চয়তা দিতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট মাহমুদ হাসান খান বলেন, পোশাকশিল্পে অনেক সময় সাব-কন্ট্রাকিং করতে হয়। সময়মতো শিপমেন্ট করতে বাধ্য হয়েই এটা করতে হয়। কিন্তু সাব-কন্ট্রাকিংয়ের ওপর ভ্যাট ও অগ্রিম কর দিতে হয়। এর ফলে মূল রপ্তানিকারক ও সাব-কন্ট্রাক্টর উভয়কে একই পণ্যের ওপর ভ্যাট ও অগ্রিম কর প্রদান করতে হয়ে, যা দ্বৈত কর। এ ধরনের দ্বৈত কর পরিহারে সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের ওপর থেকে ভ্যাট ও অগ্রিম কর প্রত্যাহারের দাবি জানান। এছাড়া টার্নওভারের ক্ষেত্রে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন তিনি।
এদিকে, রপ্তানিকারকদের সংগঠনগুলোর নেতারা প্রণোদনার ওপর ১০ শতাংশ হারে করারোপের সমালোচনা করে বলেন, এটা সরকারের একধরনের ভর্তুকি। এটিকে ‘খয়রাতি অর্থ’ উল্লেখ করে তারা বলেন, খয়রাতির ওপর কেন ট্যাক্স হবে? প্রণোদনার ওপর থেকে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমদানি প্রাপ্যতা ও বিভিন্ন টেস্টিংয়ের কারণে গত বছর আমাকে সাড়ে সাত কোটি টাকা পোর্টে ডেমারেজ দিতে হয়েছে। টেস্টের প্রয়োজন থাকলে করেন, কোনো আপত্তি নেই। আন্ডারটেকেন দিয়ে মালামাল ছেড়ে দেন। ১৫-২০ বছর ধরে ব্যবসা করে আসছি, আমার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ নেই, কিন্তু তারপরও বিভিন্ন টেস্টের কারণে ডেমারেজ দিতে হচ্ছে। এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, টেস্টিংয়ের চাহিদা এনবিআরের নয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। এ নিয়ে ঝগড়াঝাটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে করা উচিত।
আলোচনার শুরুতে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এনবিআর অযৌক্তিকভাবে ট্যাক্স নিচ্ছে বলে অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন। কিন্তু তারপরও আমরা আদায় বাড়াতে পারছি না। এ কারণে যারা ট্যাক্স দেয়, তাদের ওপরই ট্যাক্সের বোঝা বাড়ানো হয়। এ কারণে সবাই বলছে, ট্যাক্সের নেট বাড়াতে হবে। আমরা সেজন্য কাজ করছি। সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। তা না হলে দেশের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট হবে না।
তিনি আরো বলেন, দেশে এক কোটি ২৮ লাখ টিআইএনধারী রয়েছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই রিটার্ন দাখিল করেন না। আমরা তাদের নোটিস করব। যদি তারা নোটিসের জবাব না দেন, তাহলে আমাদের ইন্সপেক্টররা তাদের কাছে যাবেন এবং তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নেবেন।
ভ্যাট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে মাত্র আট লাখ ভ্যাট নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ সংখ্যা খুবই কম। আমরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য একটা মিনিমাম ভ্যাট নির্ধারণ করে দিব। তারা শুধু বছরে ওই নির্ধারিত ভ্যাট জমা দেবেন, তাদের জন্য প্রতি মাসে রিটার্ন জমা দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। এছাড়া উৎপাদিত পণ্যের ভ্যাট পরিশোধে ট্রেকিংয়ের জন্য সবধরনের প্যাকেজিং পণ্যের গায়ে কিউআর বা এআর কোড থাকবে। প্রাথমিকভাবে তামাকজাত পণ্যের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু হবে।