গবেষণা প্রতিবেদনে তথ্য
উচ্চ বাণিজ্য ব্যয়, ধীরগতির বন্দর কার্যক্রম ও দুর্বল লজিস্টিক অবকাঠামোর কারণে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। কাস্টমস জটিলতা, পণ্য পরিবহনে দীর্ঘসূত্রতা এবং আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতিতে রপ্তানি সক্ষমতায় ভারত ও ভিয়েতনামের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে দেশটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর বন্দর ব্যবস্থাপনা ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বাংলাদেশের জন্য।
গতকাল শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাণিজ্যনির্ভর বাংলাদেশের জন্য সমন্বিত বন্দর এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বৈশ্বিক লজিস্টিক সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ৮৮তম। একই সূচকে ভারতের অবস্থান ৩৮তম এবং ভিয়েতনামের ৪৩তম। শুল্ক কার্যক্রমে বাংলাদেশ রয়েছে ১০১তম স্থানে, যেখানে ভারত ও ভিয়েতনামের অবস্থান যথাক্রমে ৪৭ ও ৪৩তম। অবকাঠামোগত সক্ষমতায় বাংলাদেশের অবস্থান ১০৮তম, এখানে ভারতের ও ভিয়েতনাম ৪৭তম অবস্থানে। আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে যেখানে বাংলাদেশ ৯১তম অবস্থানে, সেখানে ভারতের ২২ ও ভিয়েতনাম ৩৮তম স্থানে। সময়নিষ্ঠতা ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থাতেও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এখানে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৭তম ও ১০৫তম। অন্যদিকে ভারত রয়েছে ৩৫তম ও ৪১তম অবস্থানে। ভিয়েতনাম আছে ৫৯তম ও ৪১তম অবস্থানে।
গবেষণা প্রতিবেদনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এখন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। তবে বিদ্যমান লজিস্টিক কাঠামো এবং ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় দেশের সম্ভাবনাকে সীমিত করে রাখছে।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিক পারফরম্যান্স ইনডেক্সে ১৩৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৭তম। যেখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বন্দরে পণ্য খালাসে এক থেকে তিনদিন সময় লাগে, সেখানে বাংলাদেশের বন্দরে গড়ে ১১ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং রপ্তানিকারকরা বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
তিনি আরো বলেন, দেশের লজিস্টিক ব্যয় ২৫ শতাংশ কমানো গেলে রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একইভাবে পণ্য পরিবহন ব্যয় ১ শতাংশ কমানো সম্ভব হলে রপ্তানি আয় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে রপ্তানি আয়ের বড় অংশই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। নতুন বাজার ও বহুমুখী পণ্যে প্রবেশ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, দেশের লজিস্টিকস খাতকে কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে জাতীয় লজিস্টিক নীতিমালার দ্রুত বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে বন্দর পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানের বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশীয় বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার খালাসের দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং বিদ্যমান নীতিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি। ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে একটি দক্ষ, আধুনিক ও সমন্বিত লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী বলেন, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার কারণে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যয়বহুল ও ধীরগতির হয়ে উঠেছে। বন্দরে দীর্ঘসূত্রতা, সড়কপথে যানজট, রেলভিত্তিক পণ্য পরিবহনের স্বল্পতা এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন সুবিধার অভাব ব্যবসা পরিচালনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে পণ্যবাহী ট্রাকের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ১৯ কিলোমিটার। অন্যদিকে রেলের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের হার মাত্র ৪ শতাংশ। ফলে সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। দ্রুত নষ্ট হওয়া কৃষি ও খাদ্যপণ্য পরিবহনে আধুনিক কোল্ড-চেইন নেটওয়ার্কের অভাবেও সরবরাহ ব্যয় বাড়ছে। দেশের বর্তমান ‘টুল পোর্ট’ মডেল থেকে দ্রুত ‘ল্যান্ডলর্ড পোর্ট’ ব্যবস্থায় যেতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক মানের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে বন্দরের পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি এআই, ব্লকচেইন, পেপারলেস অটোমেশন ও ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্য খালাসের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা যাবে।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ বলেন, সমন্বিত বন্দর ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। এর ফলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে এবং সামগ্রিক বাণিজ্য সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত। তাই রেলভিত্তিক পণ্য পরিবহন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। বন্দরের সঙ্গে রেল সংযোগ জোরদার করা গেলে কম সময় ও কম খরচে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। যোগাযোগ অবকাঠামো বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও ট্রানজিট ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। মাল্টিমোডাল কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করা গেলে দেশের রপ্তানি আয় ১৯ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলেও মত দেন তারা।