জ্বালানি সংকট, রাজস্ব আহরণে স্থবিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতির নানা চ্যালেঞ্জের মাঝেই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন এই পে স্কেলে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এর বিশাল আর্থিক জোগান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। অতিরিক্ত ব্যয় মেটানো, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি সামলানো এবং বেসরকারি খাতের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে একযোগে সব ভাতা কার্যকর হলে বছরে বেতন-ভাতায় সরকারের ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। এটি গত অর্থবছরে আহরিত রাজস্বের প্রায় অর্ধেক। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত লাগবে।
আবার নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারি কর্মচারীদের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, অভ্যন্তরীণ বাজারে তৈরি হবে বাড়তি চাহিদা। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি কেবল অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের নয়, এটি আগামী বছরগুলোতে সরকারের রাজস্ব ও ব্যয়ের কাঠামোর ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলবে। কারণ, বেতন-ভাতা একবার বাড়লে তা পরবর্তী বছরগুলোতেও বহাল থাকবে। এতে সরকারের রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্র, ঋণ ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি বিনিয়োগের সক্ষমতার ওপরও চাপ পড়বে।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামোতে বেতন পেতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরো এক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে। অর্থ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব আমার দেশকে বলেন, নতুন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হতে আরো এক-দুই সপ্তাহ লাগতে পারে। এরপর নতুন কাঠামো অনুসারে বেতন নির্ধারণ করা হবে। পরে তা ‘আইবাস প্লাস প্লাসে’ যুক্ত করা হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে এক মাস সময় লাগতে পারে।
দেশে এমন সময় নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে, যখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংকট চলছে। জ্বালানি সংকটে দেশের অনেক কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। সহসাই এ সংকট কাটার লক্ষণ দেখছে না সরকারও।
জ্বালানি সংকট কাটতে দুবছরের বেশি সময় লাগবে বলে একাধিকবার জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। এর জেরে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতায় রাজস্ব আহরণের গতিও কমেছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো নিশ্চিতভাবেই সরকারের জন্য আর্থিক চাপ তৈরি করবে বলে মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞরা।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, রাজস্ব দিয়ে বাজেটের পুরো ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না; ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। এনবিআর রাজস্ব আহরণ করেছে চার লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অর্থবছর শেষে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতি থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে ব্যয় সংকোচন ও রাজস্ব আহরণে জোর দিতে হবে সরকারকে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ সংশ্লিষ্ট খাতে মোট এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। নতুন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে এই ব্যয় আরো বাড়বে।
দেশে দীর্ঘ চার বছর ধরে চলে আসা মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে। বিবিএসের হিসাবে জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩২ শতাংশ। বাজারে এমনিতেই নিত্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। নতুন করে পে স্কেলের জন্য বাজারে উত্তাপ আরো কিছুটা বাড়বে। দেশের শ্রমবাজারের সিংহভাগ জুড়ে থাকা বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে এই পে স্কেল জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। নির্দিষ্ট ও সীমিত আয়ে চলা এসব চাকরিজীবীর আশঙ্কা, সরকারি বেতন বাড়ার প্রভাবে বাজার থেকে শুরু করে বাড়ি ভাড়া পর্যন্ত সব খরচ লাফিয়ে বাড়বে; অথচ তাদের আয়ে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, পে স্কেলের প্রভাবে বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ তৈরি হয়, যা চাহিদা বাড়িয়ে সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ‘মনস্তাত্ত্বিক মূল্যস্ফীতি’ থেকে। নতুন পে স্কেলের ঘোষণা আসায় অসাধু ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা সেটি কার্যকর হওয়ার আগেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিত্যপণ্যের দাম এবং বাড়ি ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ঋণ নিলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর তৈরি হতে পারে বাড়তি চাপ।
এই মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সীমিত আয়ের বেসরকারি কর্মীদের ওপর। বাজারে দ্রব্যমূল্যের উত্তাপ বাড়লেও অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত বেতন বাড়ানোর কোনো নীতি নেই। ফলে বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়; বাধ্য হয়ে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় কাটছাঁট করতে হয় এবং জমিয়ে রাখা সঞ্চয় ভাঙতে হয়। একদিকে সরকারি কর্মচারীদের নিশ্চিত আর্থিক নিরাপত্তা, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থান ও আয়ের অনিশ্চয়তা—দুইয়ের ব্যবধান এক ধরনের সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।
এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, নতুন জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন আমার দেশকে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও এই পে স্কেল শ্রমবাজারের সিংহভাগ জুড়ে থাকা বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। তাদের আয় না বাড়লেও খরচ বাড়বে, যা সামাজিক বৈষম্য ও তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের লক্ষ্য এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণ পরিকল্পনার সঙ্গে নতুন পে স্কেলের বাড়তি অর্থায়ন যুক্ত হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে।
কারণ, একই সময় বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়ানো জরুরি। শিল্পের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক ঋণ প্রয়োজন। সরকার যদি বড় অঙ্কের অর্থ ব্যাংক থেকে নেয়, তাহলে ব্যাংকের সীমিত আমানত ও তারল্যের একটি অংশ সেদিকে চলে যেতে পারে।
এদিকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা গতি আসতে পারে। অন্যদিকে রাজস্ব ঘাটতি, সরকারি ঋণ, সুদ ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ—সবগুলো সূচকে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সমীকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে রাজস্ব বনাম ব্যয়। সরকার যদি বাড়তি পে স্কেল ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করের আওতা ও আদায় বাড়াতে পারে, তাহলে চাপ অনেকটাই সামলানো সম্ভব। কিন্তু রাজস্ব কাঠামোর সংস্কার ছাড়া ঋণনির্ভর অর্থায়ন বাড়লে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ আমার দেশকে বলেন, দীর্ঘ ১১ বছর পর মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা কর্মচারীদের জন্য এই পে স্কেল অত্যন্ত দরকারি ছিল। তবে তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সব মিলিয়ে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা বাড়লেও রাজস্ব ঘাটতি, সরকারি ঋণ ও মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোই এখন সরকারের মূল পরীক্ষা।