হোম > বাণিজ্য > অর্থনীতি

অবকাঠামোয় অর্থায়নে বিকল্প উৎস যমুনা সেতু

১০ হাজার কোটি টাকার সুকুক ছাড়ার প্রস্তাব আইসিবির

আবু আলী

দেশের মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। সরকারের সম্পদের শতভাগ মালিকানা অক্ষুণ্ণ রেখে যমুনা সেতুর ভবিষ্যৎ টোল আয়কে আগাম নগদায়ন বা ‘অ্যাসেট মনিটাইজেশন’ করার উদ্দেশ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার ‘যমুনা সেতু সুকুক আল-ইজারা’ (ইসলামিক বন্ড) পুঁজিবাজারে ছাড়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই বিনিয়োগ সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, আইসিবির প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসার্চ ডিপার্টমেন্টের তৈরি এই কৌশলগত প্রস্তাবনাটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত হলে তা ব্যাংক ও বৈদেশিক ঋণের ওপর চাপ কমিয়ে দেশের নতুন নতুন মহাসড়ক এবং বন্দর অর্থায়নে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে একটি টেকসই দেশি বিকল্প মডেলের উন্মোচন করবে। একইসঙ্গে দেশের অবকাঠামো অর্থায়নে দেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব হবে।

শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ আমার দেশকে বলেন, সরকার এর মাধ্যমে একসঙ্গে অনেক টাকা পাবে এবং এই অর্থ দিয়ে নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে। উন্নত দেশগুলো মূলত এভাবেই তাদের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। যমুনা সেতুতে প্রতিদিন নিয়মিত ব্যাপক অঙ্কের টোল আদায় হচ্ছে, তাই এ খাতটিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। তা না হলে কেবল ঋণ নিয়ে দেশের অর্থনীতিকে বেশিদূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালনা করেই দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। এ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় পরে মেট্রোরেল বা পদ্মা সেতুকেও যুক্ত করা যেতে পারে। তবে অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে এ বিষয়ে সরকারকে দ্রুত সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বিকল্প অর্থায়নের বৈশ্বিক নজির

জানা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ আয়কে কাজে লাগিয়ে অর্থ সংগ্রহের নজির রয়েছে। আইসিবির প্রস্তাবনায় ভারতের ন্যাশনাল হাইওয়ে অথরিটি অব ইন্ডিয়ার (এনএইচএআই) সম্পদ নগদায়ন কর্মসূচির উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি টোল অপারেট ট্রান্সফার (টিওটি), ইনভিট এবং সিকিউরিটাইজেশনের মতো পদ্ধতিতে চালু সড়ক প্রকল্প থেকে ভবিষ্যতে আয় হওয়ার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেছে।

মালয়েশিয়ার উত্তর-দক্ষিণ এক্সপ্রেসওয়ে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান প্লাস এক্সপ্রেসওয়ের অর্থায়ন কাঠামোও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। সেখানে সড়ক অবকাঠামোর আয়কে ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। তুরস্কেও সড়ক ও সেতু অবকাঠামোর পরিচালনা এবং টোল আদায়ের অধিকারভিত্তিক বিভিন্ন অর্থায়ন মডেল ব্যবহৃত হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশেও অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ আয়কে অর্থায়নের উৎস হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে আইসিবি।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও সুকুকের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের বাজার এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। বাজারটি মূলত শেয়ারনির্ভর হওয়ায় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহে বিকল্প আর্থিক পণ্যের প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সুকুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগপণ্য হওয়ায় এটি ইসলামি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে নতুন সুকুকের সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ, মুনাফার হার, মেয়াদ, তারল্য এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। যমুনা সেতুর মতো চালু অবকাঠামোর নিয়মিত টোল আয় এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পণ্যের আর্থিক ভিত্তি হতে পারে।

যমুনা সেতুর আর্থিক সক্ষমতা ও প্রস্তাবিত রূপরেখা

আইসিবির প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৯৮ সালে চালুর পর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত যমুনা সেতু থেকে টোল বাবদ মোট ৯ হাজার ৩০৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। এর মধ্যে সবশেষ অর্থবছরে আদায় হয়েছে ৭৪৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। সেতুর টোল আয়কে ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহ করা গেলে সরকারের চলমান অবকাঠামো সম্পদের অর্থনৈতিক মূল্য কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।

প্রস্তাবিত সুকুকের মেয়াদ হবে ২০ বছর। এর মুনাফার হার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে মুদ্রাস্ফীতির হারের সঙ্গে অতিরিক্ত ০.৫ শতাংশ যোগ করে। এ ছাড়া ১০ বছর পর সুকুক প্রত্যাহারের সুযোগ বা কল অপশন রাখার প্রস্তাব রয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) পূরণের জন্য সুকুকটিকে অনুমোদিত সিকিউরিটি হিসেবে বিবেচনার বিষয়টিও প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব শর্ত চূড়ান্তভাবে কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

প্রস্তাবিত কাঠামোয় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) মূল সম্পদসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। আইসিবি ট্রাস্টি এবং আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সুকুকের আইনি কাঠামো, টোল আয়ের ওপর বিনিয়োগকারীদের অধিকার এবং অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

ঝুঁকি মোকাবিলায় সিংকিং ফান্ড ও সরকারি গ্যারান্টি

জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি এ অর্থায়ন কাঠামোয় কয়েকটি ঝুঁকিও রয়েছে। যানবাহন চলাচল কমে যাওয়া, টোল আদায়ে বিঘ্ন, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা নীতিগত কারণে টোলহার বাড়ানো সম্ভব না হলে প্রত্যাশিত আয় কমে যেতে পারে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় টোল আয় থেকে পরিচালন ব্যয় ও অন্যান্য দায় পরিশোধের পর উদ্বৃত্ত অর্থের একটি অংশ দিয়ে সিংকিং ফান্ড বা সংরক্ষিত তহবিল গঠনের প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে। এ তহবিল থেকে নির্ধারিত শর্তে বিনিয়োগকারীদের পাওনা পরিশোধে সহায়তা পাওয়া সম্ভব হবে।

একইসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় সরকারি গ্যারান্টি বা অন্য কোনো ক্রেডিট-সহায়তা রাখা হবে কি না—তা স্পষ্ট করা জরুরি। সরকারি গ্যারান্টি দেওয়া হলে তার পরিধি, শর্ত ও সম্ভাব্য আর্থিক দায় নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি স্বচ্ছ হিসাব, নিয়মিত টোল আয়ের তথ্য প্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং ট্রাস্টির কার্যকর তদারকি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পারে।

অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব

প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে সংগৃহীত অর্থ নতুন মহাসড়ক, বন্দর এবং অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে সরকারি সম্পদের অর্থনৈতিক ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি দেশি অর্থায়নের নতুন পথ উন্মুক্ত হতে পারে। তবে ১০ হাজার কোটি টাকার সুকুক ইস্যু, এর আর্থিক শর্ত, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর পুরো উদ্যোগের বাস্তবায়ন নির্ভর করবে।

অর্থবছরের প্রথম তিন মাস বৈদেশিক সহায়তার দ্বিগুণ অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যয়

সৃজনশীল শিল্পকে মূলধারার অর্থনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সরকার: অর্থমন্ত্রী

বিশ্বব্যাংকের কাছে ১৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ চায় সরকার

ভারতের শুল্কখড়্‌গের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের পরামর্শ ট্যারিফ কমিশনের

অর্থনীতি আটকে আছে তিন ফাঁদে

কাঠামোগত ফাঁদে আটকে আছে দেশের অর্থনীতি: হোসেন জিল্লুর রহমান

অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা কমাতে ডিজিটালাইজেশনে জোর টিসিবির

ডিসেম্বরে চালু হচ্ছে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ সেন্টার

বিশ্বব্যাংকের ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পেতে আলোচনা চলছে: অর্থমন্ত্রী

ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ