হোম > বাণিজ্য > অর্থনীতি

ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও পিছিয়ে বাংলাদেশের চামড়াশিল্প

সোহেল রহমান

ফাইল ছবি

বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়লেও সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। কাঁচামালের সহজলভ্যতা, তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় ও দীর্ঘদিনের শিল্পভিত্তি থাকা সত্ত্বেও দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই রপ্তানি খাত কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি।

পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা, সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) অকার্যকারিতা, অর্থায়ন সংকট ও নীতিগত দুর্বলতায় শিল্পটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও ফুটওয়্যার রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আয় ছিল ৯৩ কোটি ২৫ লাখ ডলার। যদিও প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে, বিশ্লেষকদের মতে সম্ভাবনার তুলনায় তা অত্যন্ত কম।

বিশ্বে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি ডলারের চামড়ার বাজার রয়েছে। সেই হিসাবে বাংলাদেশ মাত্র এক শতাংশ বাজার ধরতে পারলেও বছরে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি আয় সম্ভব ছিল।

ইউরোপ-আমেরিকার বাজার হাতছাড়া

সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীতে এখনো আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। ফলে অধিকাংশ ট্যানারি লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পাচ্ছে না। এই সনদ ছাড়া ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার বড় ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশি চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখায় না।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ আমার দেশকে বলেন, আগে ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল বাংলাদেশের বড় ক্রেতা। এখন চীন ছাড়া বড় বাজার নেই। অথচ চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে কম দামে চামড়া কিনে এলডব্লিউজি সনদের সুবিধা নিয়ে বেশি দামে ইউরোপ-আমেরিকায় বিক্রি করছে। এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, আমাদের সিইটিপি পুরোপুরি কার্যকর না থাকায় এলডব্লিউজি সনদ মিলছে না। এর কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ক্ষতি হচ্ছে। সময়োপযোগী পরিকল্পনা না থাকায় সংকট দীর্ঘ হয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার দখলে চীন, পাকিস্তান, ভারতসহ অন্যান্য দেশ আমাদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

বিডার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও আন্তর্জাতিক সনদের অভাবে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য রপ্তানি আয় হারাচ্ছে। বর্তমানে দেশের মাত্র চারটি ট্যানারি এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে, যার কোনোটিই সাভার শিল্পনগরীর ভেতরে নয়।

এক যুগেও কার্যকর হয়নি সিইটিপি

পরিবেশ দূষণ কমাতে ২০০৩ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে সাভারে স্থানান্তর প্রকল্প নেওয়া হয়। দুই বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটি শেষ হতে প্রায় দুই দশক লেগে যায়। এ সময় ব্যয় ১৭৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ১৫ কোটি টাকায়।

তবে এত বড় বিনিয়োগের পরও সাভারের শিল্পনগরী এখনো পুরোপুরি পরিবেশসম্মত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, সিইটিপির নকশাগত ত্রুটি শুরু থেকেই ছিল। প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য শোধনের সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় ২৮ হাজার ঘনমিটার। কোরবানির মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার ঘনমিটারে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, ক্রোমিয়াম পৃথকীকরণ ইউনিট পুরোপুরি কার্যকর নয়। ফলে অপরিশোধিত বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে গিয়ে পড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, গত দুই বছরে সিইটিপিতে কিছু সংস্কার করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ইতালীয় প্রতিষ্ঠান এখন কারিগরি মূল্যায়ন করছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে স্থায়ী সমাধানের রূপরেখা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কোরবানির চামড়া বিক্রি হচ্ছে পানির দরে

প্রতি বছর ঈদুল আজহায় দেশে প্রায় এক কোটি পশুর চামড়া সংগ্রহ হয়। অথচ এই বিপুল কাঁচামালের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না মৌসুমি ব্যবসায়ী ও এতিমখানা-মাদরাসাগুলো। এক সময় যে গরুর চামড়া এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা অনেক এলাকায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, চামড়ার প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় ও লবণের খরচ অনেক সময় বিক্রয়মূল্যের চেয়েও বেশি হয়ে যাচ্ছে। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে সংগ্রহকারীদের। ফলে অনেক সময় ক্ষোভে চামড়া ফেলে দিচ্ছেন সংগ্রহকারীরা।

লবণের দাম বাড়ায় নতুন সংকট

একটি বড় গরুর চামড়া সংরক্ষণে ৭ থেকে ১০ কেজি লবণ লাগে। কিন্তু সম্প্রতি লবণের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংরক্ষণ ব্যয়ও বেড়েছে। ৭৪ কেজির প্রতি বস্তা লবণ এখন বিক্রি হচ্ছে ৯৩০ থেকে ৯৫০ টাকায়, যা কয়েক মাস আগেও ছিল ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকা।

চামড়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি ট্যানারিগুলোর বকেয়া পরিশোধে বিলম্বও ব্যবসায়ীদের সংকটে ফেলছে।

চামড়ার আড়তদারদের দাবি, লবণ ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। প্রতিটি চামড়ার পেছনে শুধু পরিবহন খরচই ৪০০ টাকার বেশি পড়ে। তার সঙ্গে বাড়তি লবণ খরচ যুক্ত হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে। ট্যানারিগুলো বকেয়া টাকা সময়মতো দেয় না। আবার লবণের দামও বাড়ছে। ফলে ছোট ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারছেন না।

ঋণ কমছে, বিনিয়োগও থমকে

বাংলাদেশ ব্যাংক চামড়া ব্যবসায়ীদের দ্রুত ঋণ বিতরণের নির্দেশ দিলেও বাস্তবে ব্যাংকগুলো আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। খেলাপি ঋণের হার বাড়ায় অর্থায়ন কমে গেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে চামড়া খাতে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হলেও গত বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২৫ কোটি টাকায়। ব্যবসায়ীদের মতে, সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ছাড়া এই খাতে নতুন বিনিয়োগ সম্ভব নয়।

ভ্যালু অ্যাডিশনে পিছিয়ে বাংলাদেশ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে ভ্যালু অ্যাডিশনে পিছিয়ে থাকা। এখনো রপ্তানির বড় অংশ নির্ভর করছে ওয়েট ব্লু বা স্বল্প প্রক্রিয়াজাত চামড়ার ওপর। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে মূল মুনাফা আসে ব্র্যান্ডেড জুতা, ব্যাগ ও ফ্যাশন পণ্য থেকে। চামড়া শিল্পকে শুধু কাঁচামালভিত্তিক শিল্প হিসেবে দেখলে হবে না। ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও মানসম্পন্ন ফিনিশড পণ্যে যেতে হবে। নইলে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে।

তাদের মতে, কাঁচামাল ও শ্রমশক্তি থাকা সত্ত্বেও সমন্বিত নীতি, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত না হওয়ায় সম্ভাবনার বড় অংশ অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।

আলাদা বোর্ড গঠনের দাবি

চামড়া শিল্পের উন্নয়নে একটি স্বতন্ত্র ‘জাতীয় চামড়া বোর্ড’ গঠনের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, নীতিগত সমন্বয়, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, পরিবেশগত সনদ অর্জন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নেতৃত্বের অভাবে খাতটি পিছিয়ে পড়ছে।

এ ছাড়া এলডব্লিউজি সনদ জটিলতা কাটাতে ট্যানারিগুলোতে পৃথক ইটিপি স্থাপন, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা এবং স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণে স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য চামড়ার জুতা ও ব্যাগ ব্যবহারের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের সংশয়

সরকার চামড়া শিল্পকে অগ্রাধিকার রপ্তানি খাত হিসেবে দেখার কথা বললেও ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু মৌসুমি উদ্যোগে সংকট কাটবে না। সাভারের সিইটিপিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, এলডব্লিউজি সনদ নিশ্চিত করা, কেমিক্যাল আমদানিতে শুল্ক কমানো, সহজ অর্থায়ন ও রপ্তানি প্রণোদনা বাড়ানো ছাড়া শিল্পটিকে ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব নয়।

তাদের মতে, তৈরি পোশাক খাতের পর দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি খাত হওয়ার সক্ষমতা থাকলেও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত সংকটে সম্ভাবনাময় এই শিল্প আজ দিশাহারা।

সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এ বিষয়ে বলেছেন, চামড়া শিল্পকে সরকার অগ্রাধিকার রপ্তানি খাত হিসেবে দেখছে। কোরবানির সময় চামড়া সংরক্ষণে লবণ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ ও দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বার্ষিক ২০ লাখ টাকা টার্নওভারে বাধ্যতামূলক হচ্ছে ভ্যাট নিবন্ধন

৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা

আরো কমলো জেট ফুয়েলের দাম

বন্ধ শিল্পকারখানা চালুতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল

টেক্সটাইল খাত টেকসই করতে শিল্পের দক্ষতা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন জরুরি

ঈদের আগে স্বর্ণের দামে পতন, ভরি কত?

টাকার বিপরীতে এক বছরে রুপির দাম কমেছে ১০%

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে খরা, মন্থর জিডিপি

আবারও বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে: অর্থমন্ত্রী