রাতে ঢাকায় রাজধানীর সড়কে সিএনজি থামিয়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা। রক্তাক্ত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমান। হামলার পর সামনে এসেছে দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা—একদিকে পুলিশের কাছে আটক ব্যক্তির দাবি, একজন রোগীকে ‘ভুল চিকিৎসা’ দেওয়ার ক্ষোভ থেকেই হামলা; অন্যদিকে আহত চিকিৎসকের অভিযোগ, হামলার দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে তার কাছে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করা হয়েছিল এবং নির্ধারিত সময়ের পরই হামলা হয়েছে। ফলে এটি নিছক রোগীর স্বজনের ক্ষোভ, নাকি পরিকল্পিত চাঁদাবাজির অংশ—এই প্রশ্ন এখন তদন্তের কেন্দ্রে।
পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম আমার দেশ’কে বলেন, সকল বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত যারাই রয়েছে-সবাইকে গআইনের আওতায় আনা হবে।
গত ১৭ আগস্ট রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর শান্তিনগরে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভবন-৩ এলাকায় হামলার শিকার হন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান ও গলা (ইএনটি) এবং হেড-নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. আসাদুর রহমান। চেম্বার শেষে সিএনজি অটোরিকশায় করে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরছিলেন তিনি। পথে কয়েকজন ব্যক্তি সিএনজির গতিরোধ করে তাকে নামিয়ে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মারধর করে বলে পুলিশ ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এতে মাথা, চোখ ও নাকে গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে রাত পৌনে ১২টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।
ঘটনার পর স্থানীয়দের সহায়তায় হামলায় জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করে পুলিশের কাছে দেওয়া হয়। পরে তাকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম জীবন। পল্টন থানায় এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জীবন দাবি করেছে, এক রোগীর চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ থেকে তার বন্ধু ও স্বজনরা চিকিৎসকের ওপর হামলা করেছে। তবে পুলিশও বলছে, এ বক্তব্যই হামলার চূড়ান্ত কারণ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই; বিষয়টি আরও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সামনে আসছে চাঁদা দাবির অভিযোগ
তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য এসেছে খোদ আহত চিকিৎসকের বক্তব্যে। ডা. আসাদুর রহমানের দাবি, গত ৬ আগস্ট তার হোয়াটসঅ্যাপে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করে একটি বার্তা পাঠানো হয়। বার্তায় ১৫ আগস্টের মধ্যে টাকা দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তিনি প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ভুয়া কোনো গ্রুপের বার্তা হতে পারে বলে তিনি ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার মাত্র দুই দিন পরই তিনি হামলার শিকার হন। তার অভিযোগ, চাঁদা দাবির বার্তায় ‘ডেভিড ইমন’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছিল। হামলার পরও হুমকি অব্যাহত থাকার অভিযোগ করেছেন তিনি। হামলার প্রায় এক ঘণ্টা পর তার হোয়াটসঅ্যাপে আবার বার্তা আসে। পরদিনও তাকে সতর্ক করে বার্তা পাঠানো হয় বলে তিনি জানিয়েছেন। এসব তথ্য বর্তমানে পুলিশের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডা. আসাদুরের অভিযোগ অনুযায়ী, হামলার সময়ও দুর্বৃত্তরা একজন রোগীর নাম উল্লেখ করে তাকে ‘ভুল চিকিৎসা’ দেওয়ার অভিযোগ তোলে। কিন্তু তিনি তাদের কাছে ওই রোগী কে এবং কোথায় চিকিৎসা নিয়েছেন জানতে চাইলেও সন্তোষজনক কোনো উত্তর পাননি। একপর্যায়ে সিএনজির দরজা খুলিয়ে তাকে টেনে বের করে মারধর করা হয় বলে তিনি জানিয়েছেন। এখানেই তদন্তের বড় প্রশ্ন—হামলাকারীরা সত্যিই কোনো রোগীর স্বজন ছিল, নাকি চাঁদা দাবির বিষয়টি আড়াল করতে চিকিৎসা-সংক্রান্ত অভিযোগকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে? হামলার স্থানটি পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে হওয়ায় আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ তদন্তে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। হামলাকারীরা কোথা থেকে এসেছিল, কোন পথে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল এবং হামলার পর কোন দিকে সরে যায়—এসব তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় বের করা সম্ভব হলে ঘটনার পরিকল্পনা ও নেপথ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা মিলতে পারে।
হামলায় ডা. আসাদুর রহমানের চোখে গুরুতর আঘাত হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চোখে রক্ত জমাট বাঁধার পাশাপাশি কর্নিয়ায় ক্ষত তৈরি হয়েছে। মাথা ও নাকেও আঘাত রয়েছে। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বুধবার (১৯ আগস্ট) তার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. আ ন ম মনোয়ারুল কাদির বিটু হাসপাতালে যান। তিনি হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসার অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত হন। ডা. বিটু চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের হামলা স্বাস্থ্যসেবার স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত করে এবং চিকিৎসকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। আহত চিকিৎসকের পরিবারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তার জন্য পৃথক আইন প্রণয়নের দাবিও জানানো হয়েছে।
ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন করেছে সোসাইটি অব অটোল্যারিংগোলজিস্ট অ্যান্ড হেড-নেক সার্জনস অব বাংলাদেশ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমিতি। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরাও এতে সংহতি জানান। বক্তারা হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি করেন। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশও ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদার, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, সিসিটিভি বাড়ানো এবং চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।