তামাকজাত দ্রব্যের আইনবিরোধী প্রচারণা ও নতুন নিকোটিন পণ্যের আকর্ষণীয় প্রলোভনের ফাঁদ পেতে কিশোর-তরুণদের নেশার জালে জড়াচ্ছে তামাক কোম্পানিগুলো। জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বাস্তবায়ন এবং নতুন আইন করে ই-সিগারেট, ভেপ, নিকোটিন পাউচ নিষিদ্ধে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা।
রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে তামাক বিরোধী সংগঠন মানস আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশিষ্টজনেরা এ আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন মানস’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী। মানসের সিনিয়র প্রজেক্ট এন্ড কমিউনিকেশন অফিসার আবু রায়হানের সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য মানস’র সহ-সভাপতি অভিনেত্রী রুমানা রশীদ ঈশিতা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, ইউনিকো হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আদ্রা কুরিয়েন, মানস’র সাংগঠনিক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান তালুকদার, মানস’র সাধারণ সম্পাদক কন্ঠশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ।
সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধে অরূপরতন চৌধুরী বলেন, দেশে তামাক উৎপাদন এবং ব্যবহারজনিত কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি হয় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। তামাক খাতে রাজস্ব আসে ৪১ হাজার কোটি। ক্ষতি দ্বিগুণেরও বেশি। এমন অবস্থায় তামাক কোম্পানিগুলো শিশু-কিশোরদের তামাকপণ্যে আকৃষ্ট করতে রং, ফ্লেভার, আকর্ষণীয় ডিজাইনের মাধ্যমে প্রলোভনের ফাঁদে ফেলছে। ই-সিগারেট বিশ্বের ৪৬ দেশে নিষিদ্ধ, ৮২ দেশে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে ই-সিগারেট, ভেপ, নিকোটিন পাউচসহ ইমার্জিং তামাক পণ্যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। উপরন্তু অনলাইন পোর্টাল, সোস্যাল মিডিয়া, নাটক, চলচ্চিত্র এবং ওয়েবসিরিজে প্রধান চরিত্রগুলোতে ধূমপান, ই-সিগারেট, মাদকদ্রব্য সেবনের দৃশ্য ফোকাস করা হচ্ছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা লঙ্ঘন করে এসব প্রচারণা কিশোর-তরুণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিপদে ফেলছে। তামাক কোম্পানিগুলোর অপকৌশল প্রতিরোধ ও তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে ই-সিগারেট ও নতুন তামাক পণ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, নাটক ও চলচ্চিত্রসহ সকল বিনোদন মাধ্যমে ধূমপানের দৃশ্য বন্ধে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন এবং ওটিটি নীতিমালা পাস করা, অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তামাকপণ্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা বন্ধ করা এবং কোম্পানিগুলোকে শাস্তির আওতায় আনা, তামাক পণ্যে উচ্চ কর ও মূল্য বৃদ্ধি করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কার্যক্রম বৃদ্ধি করা, তামাক চাষের বিকল্প চাষাবাদে কৃষকদের উৎসাহিত করা, তামাক কোম্পানিতে সরকারের অংশীদারিত্ব প্রত্যাহার, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গ্রহণ এবং তামাক বিরোধী জনসচেতনতায় গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা পালনের সুপারিশ তুলে ধরেন বক্তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, রোগের চিকিৎসার জন্য মানুষকে নিজ পকেট থেকে ৮০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। দেশে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের রোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসক্রামক রোগ, যার মূলে রয়েছে তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে সিগারেট কোম্পনিগুলো নতুন আর্টিফেসিয়াল নিকোটিন পণ্য বাজারে আনছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। তিনি আরো বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে ইমার্জিং তামাক পণ্য বাদ পড়েছে। ই-সিগারেট আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে পৃথিবীর সবচাইতে স্বল্পমূল্যে তামাক পণ্য পাওয়া যায়। তামাক পণ্যে উচ্চ কর ও দাম বাড়ানো প্রয়োজন।
রুমানা রশীদ ঈশিতা বলেন, তামাকের সঙ্গে আইন ও নীতি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয় জড়িত। তবে তামাকের বিরুদ্ধে সচেতনতা সবচাইতে কার্যকর পদ্ধতি। যারা তরুণদের নেশামুক্ত সুস্থ জীবনে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন, তাদেরকে তামাকবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। তামাকের সাথে আইন ও নীতি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয় জড়িত। তবে তামাকের বিরুদ্ধে সচেতনতা সবচাইতে কার্যকর পদ্ধতি বলেই মনে করেন এই অভিনেত্রী ।
আদ্রা কুরিয়েন বলেন, রোগের চিকিৎসার চাইতে প্রতিরোধে জোর দিতে হবে। তামাক কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে প্রতিরোধযোগ্য রোগ ও মৃত্যু কমে আসবে। এ জন্য সচেতনতার বিকল্প নেই। সচেতন হলে তামাকের ব্যবহার ও ক্ষতি কমবে। তামাক নিয়ন্ত্রণে ইউনিকো হাসপাতাল সার্বিক সহযোগিতা করবে বলে জানান তিনি।