রাজধানীর শাহবাগ থানায় সংবাদ সংগ্রহের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন এখনো উপাচার্যের কাছে জমা দেওয়া হয়নি। তবে কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল রতন বলছেন, প্রতিবেদন প্রস্তুত রয়েছে এবং তা পর্যালোচনার পর্যায়ে আছে।
বিচার বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে প্রক্টর ‘চাপ’ থাকার কথা জানান। তার ভাষ্য, এ ঘটনায় দ্রুত বিচার চাওয়া এবং বিলম্বের পক্ষে থাকা—দুই ধরনের চাপ রয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম প্রশাসনের ওপর কোনো ধরনের চাপ থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
প্রশাসনের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার ভিন্ন বক্তব্যে পাঁচ মাস ধরে ঝুলে থাকা সাংবাদিক হামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ২৩ এপ্রিল শাহবাগ থানার ভেতরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির অন্তত ১০ সদস্য। ঘটনার পর শাহবাগ থানায় মামলা করতে চাইলে পুলিশ মামলা নেয়নি বলে জানায় হামলার শিকার সাংবাদিকরা। পরে এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় দায়িত্বরত প্রক্টরকে। তবে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও সেই তদন্তের প্রতিবেদন জমা না পড়ায় ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়া কার্যত থমকে আছে।
হামলার পাঁচ মাস পরও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখনো তার কাছে জমা দেওয়া হয়নি। এ কারণে তিনি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেটির আহ্বায়ক প্রক্টর। তার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেননি।
এদিকে প্রক্টর ইসরাফিল রতনের কাছে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, প্রতিবেদন প্রস্তুত রয়েছে। তবে এখনই জমা দিতে পারছি না। আমাদেরও তো কিছু সীমাবদ্ধতা আছে।
কী কারণে প্রতিবেদন জমা দেওয়া যাচ্ছে নাÑএমন প্রশ্নের জবাবে প্রক্টর বলেন, অনেক চাপ আছে।
কী এমন চাপ তা জানতে চাইলে তিনি তার কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
দ্বিধায় প্রশাসন
পরে একাধিকবার ফোন করা হলে এক পর্যায়ে প্রক্টর ফোন ধরেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি জানান, তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। বিষয়টিতে পক্ষ-বিপক্ষের অবস্থান রয়েছে। এ কারণে অনেক চাপ রয়েছে।
প্রক্টরের ভাষ্য, একপক্ষ এখনই প্রতিবেদন জমা দিতে বলছে। অন্যপক্ষ বলছে, ঘটনার সূত্রপাত উদঘাটন না করা পর্যন্ত কোনো বিচার করা যাবে না। তাদের বক্তব্য, কিছু মিনিমাইজ করে তারপর রিপোর্ট জমা দেন। আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে এটার অনুসন্ধান শেষ করা যায়।
প্রক্টর ‘মিনিমাইজ করা’ বলতে কী বোঝাচ্ছেনÑএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এটা তো একটা এন্ডিংয়ে আসতে হবে।’
মিনিমাইজ বলতে ‘অপরাধীদের ছাড় দেওয়া কি না’ এবং এ ঘটনার আদৌ কোনো বিচার হবে কি না জানতে চাইলে প্রক্টর বলেন, বিচার হবে না কেন? এটা এন্ডিং করা যাবে। সমস্যা নাই।’
প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন করে প্রক্টর বলেন, সাংবাদিক সমিতি কী প্রথাগত আইনের আশ্রয় নিয়েছে? প্রথাগত আইনের দরজাও তো খোলা আছে। এখন পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদনের কী ফলাফল আসছেÑএমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যখন তদন্ত প্রতিবেদন আসবে তখন বলা যাবে।
এদিকে আইনের আশ্রয় নেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মানজুর হোসেন মাহি এবং সাধারণ সম্পাদক লিটন ইসলাম বলেন, হামলার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্যরা শাহবাগ থানায় গিয়ে মামলা করার চেষ্টা করেছিলেন।
ডুজার সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা প্রায় এক সপ্তাহ থানায় যোগাযোগ করেছেন এবং রাতেও সেখানে অবস্থান করেছেন। তবে থানায় দায়িত্বরত কর্মকর্তারা মামলা নেননি। মামলা না নিতে শাহবাগ থানার ওসি এবং ডিসি আত্মগোপনে ছিলেন।
ঘটনার পাঁচ মাস পরও তদন্ত প্রতিবেদন ‘পর্যালোচনা পর্যায়ে’ থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রক্টর বলেন, প্রতিবেদন পর্যালোচনা পর্যায়ে আছে, আমরা আরো সময় দেওয়ার চেষ্টা করব।
প্রতিবেদন জমায় অনিশ্চয়তা
পরবর্তী চেষ্টায় আরেক দফা ফোনালাপে প্রক্টর আবার বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত রয়েছে। তখন তাকে জানানো হয়, উপাচার্য বলেছেন তার কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদন প্রস্তুত থাকলে উপাচার্যের কাছে জমা না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে প্রক্টর বলেন, ‘কি করতে হবে, আমি মেনে নেব ইনশাল্লাহ, দেখা যাক।’
সাধারণত তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত হওয়ার পর তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার কথা। এই প্রতিবেদন কবে জমা দেওয়া হবে এর কোনো সময়সীমা আছে কি না এমন প্রশ্নের পরও তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি।
তিনি বলেন, প্রতিবেদন প্রস্তুত আছে। বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। তবে এসব আলোচনা পর্যালোচনা কী এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি আর কোনো উত্তর না দিয়ে আবার ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
প্রক্টরের বক্তব্যে ‘চাপের’ কথা উঠে এলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ওবায়দুল ইসলাম এ ধরনের কোনো চাপ থাকার কথা সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
প্রশাসনের ওপর কোনো চাপ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, না না। আমাদের ওপর কোনো চাপ নেই। কোনো প্রেশার নেই।
ফলে একই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক প্রক্টর একদিকে ‘চাপ’ থাকার কথা বলছেন, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা উপাচার্য বলছেন, প্রশাসনের ওপর কোনো চাপ নেই। তদন্ত রিপোর্ট এখানো জমা হয়নি এমন দোহাই দিয়ে উপাচার্য এ ব্যাপারে বিস্তারিত মন্তব্য করতে আগ্রহ দেখাননি।
এমই