বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে ভাসমান নৌকায় বসেছে ভাতের হোটেল। নদীপথে চলাচলকারী মাঝিমাল্লা, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে স্বল্পমূল্যে খাবারের ব্যবস্থা হওয়ায় এসব হোটেল অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে জীবিকার এই উদ্যোগ ঘিরেই গড়ে উঠেছে নদীর জায়গা দখল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও চাঁদাবাজি। ফলে একদিকে নদীর পরিবেশ ও পানিদূষণ এবং নৌযান চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকা নির্বাহের মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কেরানীগঞ্জের আগানগর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ জেলা পরিষদ মার্কেটের সামনে বুড়িগঙ্গা নদীর অংশে কয়েকটি নৌকায় এমন ভাসমান ভাতের হোটেল পরিচালনা করতে দেখা গেছে। নৌকার ওপর বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি করা ছাউনির নিচে চলছে রান্নাবান্না। সেগুলোকে কেন্দ্র করে আশপাশে রয়েছে আরো কয়েকটি নৌযান। স্থানীয়দের অভিযোগ, আগানগর জেলা পরিষদ গুদারাঘাটের জায়গা দখল করে এসব ভাসমান হোটেল বসানো হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নৌকাগুলো দীর্ঘ সময় একই স্থানে অবস্থান করায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি হোটেল থেকে খাবারের উচ্ছিষ্ট, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য নদীতে ফেলা হলে দূষণ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরেজমিন নৌকার আশপাশের পানিতে কচুরিপানা ও বিভিন্ন ধরনের ভাসমান আবর্জনা দেখা গেছে।
মাঝিমাল্লা ও দিনমজুরদের জন্য স্বল্পমূল্যের খাবারের ব্যবস্থা একটি প্রয়োজনীয় সামাজিক সেবা। কিন্তু এ ধরনের খাবারের দোকান পরিচালনার কারণে যেন নদী দখল না হয়, পানিতে বর্জ্য না পড়ে এবং নৌযান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ পুরোপুরি বন্ধ করার পরিবর্তে নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় এনে পরিবেশবান্ধবভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
এদিকে, ভাসমান হোটেল পরিচালনাকারীদের কাছ থেকে প্রতিদিন চাঁদা আদায়ের অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে কারা এই চাঁদা আদায় করেন, সে বিষয়ে নাম প্রকাশ করে কিছু বলতে রাজি হননি তারা। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হাজী আনোয়ার হোসেন বলেন, বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা শুধু একটি নদী নয়, কেরানীগঞ্জ ও ঢাকার মানুষের জীবন, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পরিবেশের সঙ্গে নদীটির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই নদীর তীরে বা নদীর বুকে জীবন-জীবিকার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের উচ্ছেদের আগে বিকল্প ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা তৈরি, পানিতে বর্জ্য ফেলা এবং অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
জেলা পরিষদ মার্কেটের মুসলিম কালেকশনের স্বত্বাধিকারী মুসলিম ঢালী বলেন, বুড়িগঙ্গার তীরে পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ, স্বল্পমূল্যের খাবারের বৈধ ব্যবস্থা এবং মাঝিমাল্লা ও শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার সুযোগ—সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, নদী বাঁচলে জীবিকা বাঁচবে, পরিবেশ বাঁচবে। এ লক্ষ্যেই দখল ও দূষণমুক্ত বুড়িগঙ্গা গড়ে তুলতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।