ছাত্রদল নেতা নূরে আলমকে ২০১৬ সালে গভীর রাতে সাদাপোশাকের কয়েকজন লোক এসে তুলে নিয়ে যায়। নীলফামারী সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এই ছাত্রদল নেতাকে প্রথমে ডিজিএফআইয়ের আয়নাঘর, পরে র্যাবের আয়নাঘরে গুম রেখে নির্মম নির্যাতন করা হয়। গুম রেখে নির্যাতন ও পরে মিথ্যা মামলায় কারাগারে থাকায় শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। ফলে শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়তে হয় তাকে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ ভুক্তভোগী নূরে আলমের জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে আসে। মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে ডিজিএফআইয়ের গোপন বন্দিশালা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল বা আয়নাঘর গুম ও নির্যাতনের মামলায় সপ্তম সাক্ষী হিসেবে দ্বিতীয় দিনের জবানবন্দি দেন তিনি। এর আগে ১২ আগস্ট প্রথম দিন জবানবন্দি দেন নূরে আলম।
জবানবন্দিতে নূরে আলম বলেন, “আমি একজন গুমের ভিকটিম। ২০১৬ সালে আমি নীলফামারী সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগ শাখার ছাত্রদলের সভাপতি ছিলাম। নিয়মিত বিএনপির মিছিল ও কর্মসূচিতে অংশ নিতাম। ওই সময় ফেসবুকে বিএনপির পক্ষে এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ও ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতাম।”
তিনি বলেন, “২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল রাত দেড়টার দিকে আনুমানিক ৩৫-৪০ জন সাদাপোশাকের লোক বাড়িতে এসে আমাকে তুলে নিয়ে যায়। হ্যান্ডকাফ ও জামটুপি পরিয়ে তারা আমাকে গাড়িতে তুলে আনুমানিক ৮-১০ ঘণ্টা চলার পর ৮ ফিট বাই ১১ ফিট সেলে রাখে। সেলের দরজা ছিল দুই স্তরবিশিষ্ট। ভেতর থেকে দেখলে প্রথমে লোহার শিকের এবং পরেরটি কাঠের দরজা ছিল। রুমে একটি এক্সজস্ট ফ্যান লাগানো ছিল। এছাড়া একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব ২৪ ঘণ্টা জ্বালানো থাকত। রুমের চারদিকের দেয়ালে অসংখ্য লেখা ছিল। তার মধ্যে কিছু লেখা এমন ছিল, ‘হে আল্লাহ আমাকে উদ্ধার করো’, ‘আল্লাহ জালিমদের সাহায্য করেন না’। সেখানে থাকা অবস্থায় একদিন মাইকে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর খবর প্রচারিত হলে, তাতে ‘পূর্ব কাফরুল নিবাসী’ শব্দটি শুনতে পাই। এতে আমি বুঝতে পারি যে, আমি পূর্ব কাফরুলের আশপাশে ক্যান্টনমেন্টের কোথাও আছি। সেখানে আমি ভোরবেলা ট্রেন চলাচলের শব্দ শুনতে পেতাম। দিনের বেলা প্লেন ওঠানামার শব্দ শুনতে পেতাম।”
জবানবন্দিতে নূরে আলম আরও বলেন, “প্রথম দিন বিকেলের দিকে দুজন ব্যক্তি সেলের ভেতরে প্রবেশ করে। এক ব্যক্তি আমার নাম, আমার বাবার নাম ও মায়ের নাম জিজ্ঞাসা করে। ফেসবুকের পাসওয়ার্ড নিয়ে যায়। তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করেন যে, কেন আমি বিএনপির রাজনীতি করি, কেন আমি হাসিনা সরকার এবং ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি করি। আমাকে তুলে নিয়ে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলে, তিনি আমার ওপর আরও রেগে গিয়ে বলেন, ‘রেললাইনের পাশে, নদী-নালার পাশে এবং বস্তাবন্দী যেসব লাশ পাওয়া যায়—তা আমরাই করি। তোকে যেভাবে বলব সেভাবেই থাকবি, যেভাবে বলব সেভাবেই চলবি, তাহলে ভালো থাকবি এবং যেভাবে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসছি, সেভাবে বাসায় রেখে আসব’। এরপর তিনি আমার দুই হাঁটু এবং উরুর ওপরে বেধড়ক পিটুনি দেন। এরপর কাগজ-কলম দিয়ে কাদের সঙ্গে রাজনীতি করি তাদের নাম লিখতে বলেন। একদিন একজন নারী অফিসার আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তিনিও আমাকে আগের মতো প্রশ্নগুলো করেন। কোনো একটি আংটার সঙ্গে রশি বেঁধে আমাকে ঝুলান এবং আমার কোমর থেকে পা পর্যন্ত বেধড়ক মারধর করেন।”
জবানবন্দিতে গুমের এই ভিকটিম বলেন, “সেলে আনুমানিক ১৪-১৫ দিন থাকার পর তারা আরেকটি সেলে নিয়ে যায়। সেলের ভেতর প্রবেশ করার পর তারা আমার হাতের হ্যান্ডকাফ এবং চোখের বাঁধন খুলে দেয়। সেখানে আমি আরও চারজন ব্যক্তিকে দেখতে পাই। এই সেলটি ছিল আনুমানিক ১২ ফিট বাই ১৩ ফিট। এখানেও পাশাপাশি কয়েকটি রুম ছিল। সেখানে আমাকে আনুমানিক ৪০ দিন রাখে। তাদের সঙ্গে কোনো কথা বললে তারা আমার দুই হাতে এবং দুই কাঁধে প্রচণ্ড আঘাত করত। আমার হাত দরজার বাইরে হ্যান্ডকাফ লাগানো থাকায় আমি শুতে পারতাম না। আমি খুবই অসুস্থ হয়ে যাই, কিন্তু তারা কোনো চিকিৎসা দেয়নি। দুই হাতে সবসময় হ্যান্ডকাফ লাগানো থাকার কারণে আমার হাতে ঘা হয়ে যায় এবং ঘা থেকে রক্ত পড়ত। চোখ এবং কান সবসময় বাঁধা থাকার কারণে কানে ঘা হয়েছিল। তারা আমাকে দাঁত ব্রাশ, গোসল, টয়লেট, ওজু করার জন্য সর্বোচ্চ দুই মিনিট সময় দিত। একটু সময় বেশি লাগলে তারা সেলের ভেতর নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে লোহার শিকের বাইরে হাত বের করে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে দিত এবং সারাদিন পেটাত, কোনো খাবার দিত না। সেখানে তাজুল ইসলাম, রাজিব, ডাক্তার ইকবাল এবং রাকিব নামে আরও ব্যক্তি ছিলেন। খাবার খাওয়ার সময় আমি স্ট্যান্ড ফ্যানের পাদানির দিকে তাকালে সেখানে আমি ‘র্যাব-৪’ লেখা দেখতে পাই। এটা দেখে আমি বুঝতে পারি আমাকে র্যাব-৪-এ গুম করে রাখা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “একদিন আমাদের হাতে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে চোখ বাঁধে এবং গলা পর্যন্ত জামটুপি পরায়। এরপর গাড়িতে করে দেড় ঘণ্টা চলার পরে আমাদের একটি সেলের ভেতরে নিয়ে যায়, যা ছিল র্যাব-১০। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর সকাল আনুমানিক ৬টার দিকে গাড়িতে করে আনুমানিক ৮-১০ ঘণ্টা চলার পরে আরেকটি সেলে নিয়ে যায়। এই সেলটিও ছিল খুবই সংকীর্ণ। এখানে ঘুমাতে হলে আমার পা টয়লেট পর্যন্ত চলে যেত এবং বাম দিকে নড়াচড়া করলে পানির ট্যাপে পা লাগত। সেখানে আমি কথা বলে জানতে পারি আমার পাশে আরও কয়েকজন ব্যক্তি আছে। তারা হলো আবুজর, নাজিম উদ্দিন, তাজুল ইসলাম এবং সামি। সেখান থেকে একদিন গাড়িতে করে এনে একটি ভবনের দুই তলায় উঠিয়ে একটি খাটের ওপর বসায়। এরপর নিচে র্যাবের গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে টহল দিতে থাকে এবং হ্যান্ডমাইকে চিৎকার করতে থাকে। সেখানে তারা ৩-৪ ঘণ্টাব্যাপী মিথ্যা জঙ্গি উদ্ধারের নাটক সাজায়। ভেতরের দিক থেকে র্যাবের লোকজনের নির্দেশে বাইরের দিক থেকে র্যাবের লোকজন দরজা ভাঙতে থাকে। বাইরে কোনো এক বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে কোনো এক সাংবাদিক ভিডিও করলে রুমের ভেতরে থাকা র্যাবের লোক হামাগুড়ি দিয়ে রুমের জানালা লাগিয়ে দেয়। রুমের ভেতরে তারা ল্যাপটপে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে। এরপর সেখানে চট্টগ্রাম র্যাব-৭-এর প্রধান কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ আসেন। তিনি এসে আমাদের চোখ খুলে দিতে বলেন। চোখ খোলার পরে আমরা সেখানে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, গোলাবারুদ, বলবেয়ারিং, তার, গুনা, পেরেক এবং বই দেখতে পাই। এরপর মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ সেগুলোর তালিকা তার হাতে দিতে বলেন এবং মালগুলো নিচে সঠিকভাবে সাজাতে বলেন। এভাবে তারা মিথ্যা জঙ্গি নাটক সাজিয়ে তাদের সফল অভিযান পরিচালনা করে। এরপর আমাদেরকে আকবর শাহ্ থানায় হস্তান্তর করে এবং আকবর শাহ্ থানা পুলিশ আদালতের মাধ্যমে আমাদেরকে জেলখানায় প্রেরণ করে।”
জবানবন্দিতে নূরে আলম আরও বলেন, “র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদের সময় এএসপি রুহুল আমিন আমাকে বলেন, ‘তোমাকে ডিজিএফআইয়ের লোকজন বাসা থেকে তুলে নিয়ে এসেছে এবং তোমাকে প্রথমে যে জায়গাটিতে রাখা হয়েছিল সেটি ছিল ডিজিএফআই ও পরেরটি ছিল টিএফআই’। এরপর তারা আমাদের কারাগারে প্রেরণ করেন। দীর্ঘ ১১ মাস মিথ্যা মামলায় কারাভোগের পর আমি বর্তমানে উচ্চ আদালতের আদেশে জামিনে মুক্ত হই। আমাকে গুমের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের মধ্যে আছে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিকীসহ ডিজিএফআইয়ের লোকজন এবং র্যাবের লোকজন। আমি তাদের শাস্তি চাই এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করছি।”