হোম > আইন-আদালত

খোকনের সঙ্গে বিতণ্ডায় প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগ

স্টাফ রিপোর্টার

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও নোয়াখালী-১ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডার একপর্যায়ে আদালত মুলতবি করে পুরো বেঞ্চসহ এজলাস ছাড়েন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। বিচার বিভাগের ইতিহাসে এই বিরল ঘটনা ঘটে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের এক নম্বর এজলাসে।

এ ঘটনার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ বিচার বিভাগ-সংশ্লিষ্টরা সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

আদালত কক্ষে ঘটনার পর ব্যারিস্টার খোকন সুপ্রিম কোর্ট এনেক্স ভবনের কাছে এসে সাংবাদিকদের বলেন, সকালে আপিল বিভাগের এক নম্বর তালিকায় থাকা একটি মামলায় একজন জুনিয়র মহিলা আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে, যা কোনোভাবে কাম্য নয়।

তিনি বলেন, তালিকার ১৩ নম্বর মামলা (আইটেম) শেষ হওয়ার পর আমি প্রধান বিচারপতিকে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আপিল বিভাগে মামলা খুব একটা হচ্ছে না। আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে। একজন জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা কস্ট দেওয়া (জরিমানা) অনেক বেশি হয়ে গেছে। তাকে মাফ করে দেন।

তখন তিনি (প্রধান বিচারপতি) বললেন, আমি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে? আমি তখন বললাম, ইনকাম ওই সেন্সে কমে গেছে... আমি বোঝাতে চেয়েছি, আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন। তিনটি বেঞ্চ ছিল। এখন একটি বেঞ্চ। একটি মামলা স্টে হলে সেখানে শুনানি করতে পারছি না। এমনকি চেম্বার জজে স্টে করছে, এটা হিয়ারিং করতে এক বছর লাগে।

আইনজীবী খোকন বলেন, সেখানে কেন কোনো মেনসন করা যায় না? কেন এই মামলাটা উপরে ছিল (কজলিস্টে), নিচে গেলে কেন মেনসন করা যায় না? যেহেতু একটি বেঞ্চ, মানুষ দীর্ঘদিন থেকে ন্যায়বিচার পাচ্ছে না, মামলা শুনানি করতে পারছে না। মামলা হলে আইনজীবীদের ইনকাম হবে। কম হোক, বেশি হোক। আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম। আমি চিন্তা করিনি যে, উনি এত রিঅ্যাক্ট করবেন। ওনাদের তো রাগ-অভিমানের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার করার কথা। আর আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে আমার অবলিগেশন আছে, ওনার কাছে আইনজীবীদের পক্ষে আবেদন করার।

এ ঘটনায় অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আইনজীবীদের কল্যাণে ও স্বার্থে আদালতে বলেছেন বলে দাবি করেছেন। আসলে এমন কোনো কথা আজকের (মঙ্গলবার) মামলার প্রসিডিংয়ে (কার্যধারা) হয়নি।

নিজ কার্যালয়ে বেলা সোয়া দুটার দিকে ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল বলেন, প্রধান বিচারপতি বিচারিক শৃঙ্খলা ও সততা প্রাধান্য দেন। আদালতের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতারণা ও ফাঁকির বিষয়টি তিনি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন।

ঘটনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১৩ সালে একজন কাজী নিয়োগকে কেন্দ্র করে একটি মামলার সূত্রপাত, যেখানে সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন খোকন। এই মামলায় বাদী পাঁচটি রিট করেছেন একই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে। অথচ আগে রিজেক্ট হওয়ার আদেশটি পরবর্তী রিটে গোপন করা হয়। যে কারণে রিট ফাইলকারী নারী আইনজীবী ও রিট আবেদনকারীকে আপিল বিভাগ পাঁচ লাখ টাকা করে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। এই টাকা সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নারী আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ীও মামলায় সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন মাহবুব উদ্দিন খোকন। সকালে যখন আদেশ হয়, তখন নারী আইনজীবী আমার পাশে বসে আদেশটি শুনেছেন, তখন খোকন আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। ওই মামলায় সকাল সোয়া নয়টার দিকে আদেশ হয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বেলা ১২টা ৩৫ মিনিটে অন্য একটি মামলায় ব্যারিস্টার খোকন আদালতের জরিমানা আরোপ প্রসঙ্গে বলেন, একজন আইনজীবীকে আপনারা ফাইন করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, দেখেন, আমরা সবকিছুতে দেখেশুনে একটা আদেশ দিয়েছি, আমাদের আদেশ আমরা পরিবর্তন করব না। কারণ, ওনাদের (আদালত) বক্তব্য অনুযায়ী সিরিয়াস ফ্রড করা হয়েছে। আদালতের সঙ্গে প্রতারণা এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এর আগের আদেশও ফ্রড করা হয়েছে।

তখন অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলে ফেললেন যে, ‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।’ বিষয়টি প্রধান বিচারপতি একটু লাইটলি নিলেন। তারপর বললেন, ‘আপনি (খোকন) কি এটা মিন করেন? খোকন অনেকটা সেই একই কথা বলার যখন চেষ্টা করেন, তখন প্রধান বিচারপতি বলেছেন যে, ‘আপনি (খোকন) যে কথাটা বলেছেন, সেটা অ্যাবসলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এতবড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজকে আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না।’ এ কথা বলে উনি (প্রধান বিচারপতি) অন্যদের সঙ্গে নিয়ে উঠে এজলাস ত্যাগ করেন।

ঘটনার সূত্রপাত যে মামলায়

নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ সংক্রান্ত ঘটনায় একাধিক রিট করায় তথ্য গোপন ও প্রতারণার অভিযোগে রিটকারী মো. নুর আলম ও তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে আপিল বিভাগ। যাত্রাবাড়ী থানার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে একাধিক রিট করেন নুর আলম। জরিমানার অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে দিতে বলা হয়। রিটকারী নুর আলমের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী খোকন। একই ব্যক্তি ধাপে ধাপে পাঁচবার রিট করেন। প্রতিটিতে আগের রিট আবেদন খারিজের তথ্য গোপন করা হয়।

অপর নিকাহ রেজিস্ট্রার মুরাদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত।

যা বললেন রেজিস্ট্রার জেনারেল

ঘটনা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী আমার দেশকে বলেন, এ ধরনের গুরুতর জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার অপরাধে বিগত বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালতে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার নজির রয়েছে। এ বিষয়ে আজকের (মঙ্গলবার) আদালতের ঘটনাটি আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সবাই দেখেছেন।

সিনিয়র আইনজীবীদের বক্তব্য

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন আমার দেশকে বলেন, বার সভাপতি ব্যারিস্টার খোকন সাধারণ আইনজীবীদের প্রতিনিধি। তিনি আইনজীবীদের দুঃখ-কষ্ট অনুধাবন করবেন এটাই স্বাভাবিক। কোর্ট যেমন বার ছাড়া চলবে না, তেমনি বারও কোর্ট ছাড়া অচল। তাই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকে সবাইকে কাজ করা উচিত। তবে ব্যারিস্টার খোকন আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়া, মামলা পরিচালনায় সমস্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আকর্ষণে প্রধান বিচারপতির কাছে অভ্যন্তরীণভাবে বলতে পারতেন। তিনি এভাবে প্রকাশ্য আদালতে অবতারণা না করলেও পারতেন। এটি সবার জন্য ভালো ইমেজের বার্তা বহন করে না।

পেশাগত নিষ্ঠার অভাব নিয়ে উদ্বেগ

দেশের আইনজীবীর মধ্যে মামলার প্রতি যথেষ্ট দায়বদ্ধতা ও পেশাগত নিষ্ঠার অভাব নিয়ে সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। গত ২০ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকারের কর্মজীবন স্মরণে দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে তিনি আইনজীবীদের পেশার প্রতি আরো ডেডিকেশনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, অনেক সময় দেখা যায়, আইনজীবীরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়াই আদালতে হাজির হন।

তিনি আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা যেন কেবল সেই পরিমাণ মামলা গ্রহণ করেন, যেগুলোর প্রতি যথাযথ সময়, প্রস্তুতি ও মনোযোগ দিতে সক্ষম হবেন। কারণ তিনি আপনাকে প্রফেশনালি নিয়োগ করেছেন। তার প্রতি সুবিচার করা আপনার লিগ্যাল, এথিক্যাল ও মরাল দায়িত্ব।’

সাভারে পুলিশ হত্যা: গ্রেপ্তার ৮ আসামি রিমান্ডে

বিআরটিএর ইকুরিয়া কার্যালয়ে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম

জামিনে কারামুক্ত হলেন বিদিশা এরশাদ

১০৪ বছর বয়সে ১০ বছরের সাজা নিয়ে কারাগারে নুর মোহাম্মদ

আইনজীবীকে জরিমানার বিষয় উপস্থাপন করলেন বার সভাপতি, একপর্যায়ে এজলাস ছাড়লেন বিচারপতিরা

স্বামী জুলাই বিপ্লবে শহীদ, স্ত্রী সাক্ষ্য দিতে এলে মেয়েকে ধর্ষণ, অপমানে আত্মহত্যা

ওবায়দুল করিমের বিদেশযাত্রা ঠেকাতে উচ্চ আদালতে দুদক

সাভারে পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা, ৫ দিনের রিমান্ডে প্রধান আসামি

প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে প্রবেশের চেষ্টা, যুবক রিমান্ডে

ট্রাইব্যুনালে ‘জন্মদিনের কেক ঢোকার ঘটনায়’ ৪ পুলিশ সদস্যকে শোকজ