খুলনায় মায়ের মৃত্যুর ৩৬ বছর পর বাবার বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন মেয়ে। অভিযুক্ত ডা. শেখ বাহারুল আলম বাহার এপিসি ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান। তিনি খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামীপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সাবেক সভাপতি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) খুলনার বর্তমান সভাপতি তিনি। অভিযোগকারী শেখ তামান্না আলম খুলনা নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার কেডিএ এপ্রোচ রোডের বাসিন্দা।
খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সোনাডাঙ্গা আমলি আদালতে মামলাটি করেছেন তামান্না। মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৯ সালের ১৩ নভেম্বর রাত ৪টার দিকে তৎকালীন খ্যাতনামা গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. সামসুন্নাহার মিলনের গলায় রশি বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। ডা. শেখ বাহার তার স্ত্রী সামসুন্নাহারকে খুন করে সে সময় আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেন। অভিযোগে তামান্না আলম বলেন, রাজনৈতিক ও পেশাগত পরিচয়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী বাবার পরকীয়া এবং নির্মম শারীরিক নির্যাতনে তার মায়ের মৃত্যু হয়।
এজাহারে তামান্না অভিযোগ করেন, প্রেমের সম্পর্কের সূত্রে তার বাবা-মায়ের বিয়ে হলেও বিয়ের পর বাহারুল আলমের পরকীয়া সম্পর্কের বিরোধিতা করেন তার মা। এতে তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। নির্যাতন থেকে পরিত্রাণ পাওয়া জন্য দুই মেয়েকে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় সেটেল করার প্রস্তুতি শুরু করেন। কিন্তু সম্পদের লোভে বাহারুল তার স্ত্রী সামসুন্নাহার যেন মেয়েদের নিয়ে বিদেশে যেতে না পারেন, সে জন্য তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
ওই বছরের ১৩ নভেম্বর রাত ১২টার পর বাহারের সঙ্গে তার মায়ের তুমুল ঝগড়া হয়। সে সময় ১৪ বছর বয়সি তামান্না আলাদা রুমে এবং তার ছোট বোন মা-বাবার সঙ্গে ঘুমাত। পরদিন ভোর ৪টার দিকে বাহার তাকে ঘুম থেকে ডেকে ড্রইং রুমে নিয়ে যান। সেখানে তার মায়ের রশিতে বাঁধা ঝুলন্ত দেহ দেখে চিৎকার করে ওঠেন। তামান্না বাবার কথামতো মায়ের গলার রশি খুলে দিলে নিচে নামিয়ে আনেন। বাহার নিজেই স্ত্রীকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। পরে লাশের সুরতহাল ও আসামির তত্ত্বাবধানে ময়নাতদন্ত হয় এবং অস্বাভাবিক মৃত্যু বলে প্রতিষ্ঠিত হয়।
তামান্নার দাবি, লেখাপড়া শেষে বিয়ে করে কানাডা সেটেল হন তিনি। এ সময় বাবার সঙ্গে বিভিন্ন নারীর অবৈধ পরকীয়া সম্পর্ক বিদ্যমান থাকায় দেশে অবস্থানরত তার ছোট বোন ডা. শেখ তাসনুভা আলমের সঙ্গে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। পারিবারিক বিরোধ মীমাংসার জন্য তিনি দেশে ফিরে এলে বাবার নানা অপকর্মের প্রমাণ পান। এক পর্যায়ে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তুমুল বাগ্বিতণ্ডার এক পর্যায়ে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোর মায়ের মতো অবস্থা হবে, কাকপক্ষীও জানতে পারবে না।’ এ কথায় তিনি বুঝতে পারেন তার মা আত্মহত্যা করেননি, তাকে খুন করা হয়েছিল। পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য হতে প্রকাশ পায় যে, বাহার তাকে (সামসুন্নাহার) খুন করেছিলেন।
যা বলছেন ডা. বাহার
ডা. সামসুন্নাহার আত্মহত্যা করেছিলেন জানিয়ে ডা. বাহার বলেন, সোনাডাঙ্গা থানার ওসি ফোর্স নিয়ে এসে তাকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝোলানো অবস্থা থেকে নিচে নামান। এরপর সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম হয়, যেখানে তৎকালীন সিভিল সার্জন উপস্থিত ছিলেন। সুইসাইডের কারণে তখন কোনো মামলা হয়নি। পরদিন আমার স্ত্রীর মা, ভাই, বোন খুলনা পৌঁছান, তার এক বোন ডাক্তার। তারাও কোনো অভিযোগ করেননি। এত বছর পর তামান্না আলম কারো দ্বারা প্ররোচিত হয়ে মামলা করেছে বলে মনে করছি। তিনি বলেন, ‘মামলার ধার্য করা দিনে আদালত যদি আমাকে সমন জারি করে, আমি সেখানেই আমার কথা বলব। এ মামলায় আমি বিচলিত নই। আমার স্ত্রীর একটি সুইসাইডাল নোট ছিল। সিআইডিকে বলব সেটি আদালতে হাজির করতে।’