জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় শাহরিয়ার খান আনাসসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় মঙ্গলবার হচ্ছে না। রায়ের জন্য তারিখ পিছিয়ে ২৬ জানুয়ারি দিন ধার্য করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল নতুন এই দিন ধার্য করে। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন— বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রায় প্রস্তুত না হওয়ায় তারিখ পেছানো হয়েছে।
এর আগে গত ২৪ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর রায়ের জন্য এই দিন নির্ধারণ করে।
আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের প্রায় আট মাস পর আজ এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। এটি ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধসংক্রান্ত দ্বিতীয় রায় হতে যাচ্ছে।
এর আগে গত বছরের ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দুই শীর্ষ সহযোগীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রথম রায় ঘোষণা করে। ওই রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে প্রসিকিউটর গাজী তামীম বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ ২৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দির পাশাপাশি অসংখ্য নথিপত্র, অডিও-ভিডিও ও ফরেনসিক প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা ও শেখ ফজলে নূর তাপসের কথোপকথনের রেকর্ড, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের ওয়্যারলেস অডিও বার্তা, পুলিশের গুলিবর্ষণের ভিডিও ফুটেজ, নিহতদের মৃত্যুসনদ এবং ঘটনার দিন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের কাছে অস্ত্র ইস্যুর রেকর্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, যেসব কর্মকর্তার নামে অস্ত্র ইস্যু করা হলেও তারা গুলি চালাননি, তারাও ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এসব প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা নিশ্চিত, সব আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সে কারণে আমরা সর্বোচ্চ শাস্তির পাশাপাশি পলাতক আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছি।
চানখাঁরপুল মামলায় আট আসামি হলেন—ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, তৎকালীন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মোহাম্মদ আখতারুল ইসলাম, ডিএমপির রমনা জোনের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল, শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক (অপারেশনস) আরশাদ হোসেন, কনস্টেবল সুজন, ইমাজ হোসেন ও নাসিরুল ইসলাম।
তাদের মধ্যে আরশাদ, সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। বাকি আসামিরা পলাতক।
জুলাই বিপ্লবে আসামিদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ষড়যন্ত্র, উসকানি, সহায়তা ও প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। ওই আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার পতন হয় এবং তিনি ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এছাড়া চারজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দায় আনা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, হাবিবুর রহমান, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও মোহাম্মদ ইমরুলসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি হত্যার নির্দেশ দেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে নির্দেশনা দেন এবং হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করেন।
মামলায় উল্লিখিত শহীদদের তালিকায়—শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, মোহাম্মদ ইয়াকুব, রাকিব হাওলাদার, ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া।
গত ২০ এপ্রিল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে আইসিটির তদন্ত সংস্থা।
এ মামলায় প্রথম রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট সাক্ষ্য দেন শাহরিয়ার খান পলাশ। তিনি শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের বাবা। মামলায় মোট ২৬ জন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী এবং একজন আসামিপক্ষের সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন।