বলেশ্বর নদীর পশ্চিম তীরে ২০১০ সালের ১৭ মে অজ্ঞাতনামা, পেট কাটা ও সিমেন্টের বস্তা বাঁধা একটি গলিত লাশ পাওয়া যায় বলে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন বাগেরহাটের শরণখোলা থানার তৎকালীন ওসি নিজাম উদ্দিন হাওলাদার। পরে পরিবারের সদস্যরা লাশটি বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলামের বলে দাবি করেন। রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এসব কথা বলেন ওসি নিজাম উদ্দিন হাওলাদার।
আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে নবম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।
জবানবন্দিতে নিজাম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, ‘বর্তমানে আমার বয়স ৬০ বছর। আমি অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। ঘটনার সময় আমি বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানার ওসি হিসেবে কর্মরত ছিলাম। ২০১০ সালের ১৭ মে আমি সরকারি বিশেষ কাজে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে বাগেরহাটে যাই। ওইদিন বেলা ৩টার দিকে থানার একজন চৌকিদার আমাকে ফোন করে জানান, বলেশ্বর নদীর পশ্চিম তীরে একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশ পড়ে আছে। লাশটির মাথা কাপড় দিয়ে ঢাকা, হাত-পা বাঁধা এবং শরীরে সিমেন্টের বস্তা বাঁধা ছিল। লাশটি গলিত অবস্থায় ছিল।’
নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘তখন আমি থানার দায়িত্বে থাকা এসআই ইকবালকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলি। এসআই ইকবাল লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। ওইদিন রাত হয়ে যাওয়ায় লাশটি থানায় নিয়ে আসা হয়। রাতে থানায় লাশটি পচন ধরা অবস্থায় দেখি। পরদিন সকালে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তের পর লাশটি অজ্ঞাত হওয়ায় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়।’
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘দুই দিন পর এক ব্যক্তি আমাকে ফোন করে দাবি করেন, লাশটি তার ভাইয়ের। তিনি আরো জানান, আনুমানিক দুই-তিন মাস আগে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া থেকে তার ভাইকে অপহরণ করা হয়। এ ঘটনায় কোটালীপাড়া থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমি তাদের থানায় আসতে বলি।’
‘চার-পাঁচ দিন পর মৃত ব্যক্তির দুই ভাই, স্ত্রী ও চাচা থানায় আসেন। তারা শার্ট ও প্যান্ট দেখে লাশটি শনাক্ত করেন। মৃত ব্যক্তির স্ত্রী দাবি করেন, লাশটি তার স্বামীর। আমি তাদের জানাই, অজ্ঞাত হওয়ায় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি বাগেরহাট কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।’
ওসি নিজাম আরো বলেন, ‘আমি তাদের বলি, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে লাশটি নিতে পারবেন। থানায় আসা ব্যক্তিরা জানান, লাশটি একজন সাবেক বিডিআর সদস্যের। তার নাম নজরুল ইসলাম। পিলখানা ঘটনার পর তিনি পলাতক অবস্থায় গোপালগঞ্জের একটি ক্লিনিকে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।’
‘চার-পাঁচ দিন পর খুলনা বিডিআরের পক্ষ থেকে একজন কর্নেল ফোন করে লাশটির সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চান। তিনি আরো বলেন, একজন বিডিআর সদস্য থানায় আসবেন, তাকে যেন আমি কাগজপত্র দিয়ে সহায়তা করি। প্রয়োজনে তিনিও ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে চান।’
উল্লেখ্য, এই মামলায় নজরুল ইসলামের স্ত্রী মুন্নি আক্তারও জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি জানান, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তারা নিশ্চিত হয়েছেন, লাশটি বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলামেরই। জিয়াউল আহসান তার স্বামীকে গুম করে হত্যা করেছেন বলে তারা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন।