বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্তে চট্টগ্রাম সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের তিন সদস্য অযোগ্য ও অনুপযুক্ত এবং বাকিরা নিষ্ক্রিয় হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর, সেখানে সরকার কর্তৃক প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্তকে বৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি ফাতেমা নজিব এবং বিচারপতি এ. এফ. এম. সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২৯ এপ্রিল এ সংক্রান্ত রিট আবেদন খারিজ করে চূড়ান্ত এ রায় দেন।
আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়, ইউজিসির ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সরওয়ার জাহান, তার স্ত্রী ড. ইসরাত জাহান এবং বোর্ডের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে ‘ব্রিচ অব ট্রাস্ট’ বা চরম বিশ্বাসভঙ্গের কথা বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে এই তিনজনকে ট্রাস্টি হিসেবে অযোগ্য ও অনুপযুক্ত এবং বোর্ডের অন্য সদস্যদের নিষ্ক্রিয় ও অকার্যকর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তদন্তে তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এবং ট্রাস্ট আইন, ১৮৮২-এর বিধান লঙ্ঘন করে একক কর্তৃত্বে আর্থিক লেনদেন পরিচালনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও সম্পদের অপব্যবহার এবং নিজেদের লাভবান করার প্রমাণ পাওয়ার কথা তুলে ধরা হয়। আর ইউজিসির ওই তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই আদালত এই রায় দিয়েছেন। একইসাথে মামলার বিষয়ে আদালতের দেওয়া পূর্বের স্টে-অর্ডার বা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।
উচ্চ আদালত প্রশাসক নিয়োগের সরকারি সিদ্ধান্তকে বৈধতা দিয়ে জানান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ৩৫(৭) ধারা অনুযায়ী চ্যান্সেলর (রাষ্ট্রপতি), ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক্রমে যেকোনো প্রয়োজনীয় আদেশ জারি করতে পারেন। সে হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ওমর ফারুককে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং চ্যান্সেলর তার আইনগত ক্ষমতার মধ্যেই এটি করেছেন।
পরবর্তীতে সরওয়ার জাহান এই প্রশাসক নিয়োগ ও ট্রাস্টি বোর্ডের স্থগিতাদেশের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে শুনানি শেষে তা ভিত্তিহীন বলে বাতিল ঘোষণা করেন আদালত। তবে অভিযোগ উঠেছে, আদালতের রায়ে প্রশাসক নিয়োগ বৈধ এবং পূর্বের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার বলে ঘোষিত হলেও একটি কুচক্রী মহলের যোগসাজশে পরবর্তীতে প্রশাসক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে, যা আদালত অবমাননার শামিল।
দুর্নীতির মামলা ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিতর্ক: জাল সনদের অভিযোগের তদন্তের ভিত্তিতে ইতোমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে সরওয়ার জাহানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে মামলা (এফআইআর) দায়ের করেছে। এর আগে ইউজিসির তদন্ত কমিটি সরওয়ার জাহান ও তার স্ত্রী ইসরাত জাহানের বিরুদ্ধে ডজনখানেক অভিযোগের সত্যতা পায়।
এদিকে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য (ভিসি) পদ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলছে। ট্রেজারার শরীফ আশরাফুজ্জামানের শিক্ষাগত ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালনে বসানো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুসারে ভিসি হতে হলে মোট ২০ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হলেও পেট্রোলিয়াম কোম্পানির সাবেক কর্মকর্তা শরীফ আশরাফুজ্জামানের তা নেই। এমনকি তার ট্রেজারার পদের মেয়াদও কয়েক মাস আগে উত্তীর্ণ হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালে চার বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি মোজাম্মেল হককে বেআইনিভাবে অব্যাহতি দিয়ে খলিলুর রহমানের নির্দেশে শরীফ আশরাফুজ্জামানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রার মোদাচ্ছের আলীকে ঘিরেও বিতর্ক রয়েছে; ২০২২ সালের ৮ মার্চ তিনি আওয়ামী লীগের কালচারাল ফ্যাসিস্টদের সাথে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর উচ্ছেদের জন্য তৎকালীন ডিসিকে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন।
মালিকানা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ: জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির মূল মালিক ছিলেন ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক এমডি রেজাউল আলম। তিনি সরওয়ার জাহানকে এটি পরিচালনার দায়িত্ব দিলে পরবর্তীতে তিনি সুযোগ বুঝে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ সালামসহ অন্যান্যদের নিয়ে একটি পৃথক ট্রাস্ট গঠন করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দুটি ট্রাস্টি বোর্ড বিদ্যমান রয়েছে এবং মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে।
আইনি জটিলতার কারণে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন শিক্ষার্থী ভর্তিতে নিষেধাজ্ঞা দিলেও ট্রাস্টি বোর্ড বারবার রিট করে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের মার্চে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশাসক নিয়োগ দিলেও ট্রাস্টি বোর্ডের অসহযোগিতায় প্রশাসক মাত্র দুই দিন অফিস করতে পেরেছিলেন।
সার্বিক বিষয়ে জানার জন্য সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, সদস্য সরোয়ার জাহান ও ইসরাত জাহানকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল ও বার্তা পাঠানো হলেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক জেসমিন পারভীন জানান, আমি নতুন যোগদান করায় বিস্তারিত এখনই বলতে পারছি না। তবে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ সরকারি আদেশের বিরুদ্ধে প্রায়ই রিট দায়ের করছে। একজন ট্রেজারার কত দিন ভিসির দায়িত্ব পালন করতে পারেন তাও খতিয়ে দেখা দরকার। উত্থাপিত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হচ্ছে, ইউজিসির আইন অমান্য করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না।