নিজের ছাত্রজীবনে আর্থিক সংকটের কারণে যে মানুষটি শিক্ষার্জনের পথে নানা বাধার মুখোমুখি হয়েছেন, কর্মজীবনে তিনিই হয়ে উঠেছেন শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণের সহযাত্রী। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রেই তার কাছে শিক্ষকতা কেবল পেশা নয়, বরং মানুষ গড়ার এক অনন্য দায়িত্ব। দীর্ঘ প্রায় চার দশকের শিক্ষকতা জীবনে নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতার পরিচয় দিয়ে এবার জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছেন নেত্রকোনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবু তাহের খান।
জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০২৬-এ ময়মনসিংহ বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানপ্রধান নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া গুণী শিক্ষক সম্মাননা পদক অর্জন করেছেন তিনি। তার এ অর্জন ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষার্থীবান্ধব নেতৃত্ব ও দায়িত্বশীল শিক্ষকতারও স্বীকৃতি।
সংগ্রাম থেকে সাফল্যের পথে
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার এক অসচ্ছল কৃষক পরিবারে জন্ম আবু তাহেরের। শৈশব থেকেই মেধাবী এই শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয় গ্রেডে এবং অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৮৩ সালে কলমাকান্দা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হন নেত্রকোনা সরকারি কলেজে।
কিন্তু উচ্চশিক্ষার পথ তার জন্য সহজ ছিল না। আর্থিক সংকটে নেত্রকোনা শহরে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। কলমাকান্দায় থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়িয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগানোর চেষ্টা করেন। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পারিবারিক সমস্যার কারণে মাত্র সাত দিন ক্লাস করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
নেত্রকোনা সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সপ্তম স্থান অর্জন করেন। পরে সরকারি আনন্দ মোহন কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে সপ্তম স্থান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
নিজের জীবনের এই সংগ্রামই তাকে শিক্ষার মূল্য বুঝতে শিখিয়েছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যে সুযোগগুলো তিনি পাননি, কর্মজীবনে শিক্ষার্থীদের জন্য সেগুলো তৈরি করার তাগিদ অনুভব করেছেন সব সময়।
ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে শিক্ষকতায়
জীবিকার প্রয়োজনে ছাত্রজীবনেই কাজ করেছেন তিনি। মাস্টার্স শেষ করে নিয়োগ পরীক্ষায় মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করে অগ্রণী ব্যাংকের অফিসার পদে যোগ দেন। তবে তার আকর্ষণ ছিল শিক্ষকতায়। ১৯৯৬ সালে ১৬তম বিসিএসের মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, সরকারি আনন্দ মোহন কলেজ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, গৌরীপুর সরকারি কলেজ, নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজ ও ফুলবাড়ী সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। গণিতের শিক্ষক হিসেবে পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছেন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা।
তার কর্মদর্শনের অন্যতম দিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখা। তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাদের আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ গঠনের পরিবেশও তৈরি করতে হয়।
নিজের এলাকায় শিক্ষার সুযোগ তৈরি
দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষাজীবনে বাধার অভিজ্ঞতা থেকে নিজ এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগেও যুক্ত হন অধ্যাপক আবু তাহের। একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো নির্মাণে ব্যক্তিগতভাবে ১৭ লাখ টাকা অনুদান দেন।
তার প্রচেষ্টায় নেত্রকোনা সরকারি কলেজ ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে পাঠদানের অনুমতি পায়। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে এবং চলতি বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাডেমিক স্বীকৃতি লাভ করে।
প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও উপাধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন। দুই বছরের বেশি সময় ধরে অধ্যক্ষের দায়িত্বে থেকে কলেজটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার কাজ করছেন।
শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য বিআরটিসি বাস সার্ভিস চালু এবং মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠা তার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। পাশাপাশি ছাত্রাবাস, ১০ তলাবিশিষ্ট অ্যাকাডেমিক ভবন ও অডিটোরিয়াম নির্মাণসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের মেধা ও প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব বিকাশেও রয়েছে তার বিশেষ উদ্যোগ। কলেজের ১৪টি অনার্স বিভাগের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সেরাদের পুরস্কৃত করা হয়। চার বছরে ৫৬টি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৫৬০ জন শিক্ষার্থীকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ফলাফলের ভিত্তিতে পুরস্কার বিতরণের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করা এবং যোগ্যতার স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
স্বীকৃতির চেয়েও বড় মানুষ গড়ার দায়িত্ব
জাতীয় পর্যায়ে সম্মাননা অর্জনের প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক আবু তাহের বলেন, দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এ অর্জনকে দেখছেন। একসময় আর্থিক সংকটের কারণে নিজের পড়াশোনার পথ সহজ করতে পারেননি, অথচ এখন শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিতে পারছেন—এটিই তার কাছে বড় প্রাপ্তি।
তার ভাষায়, শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব। প্রতিকূলতা মানুষের পথ কঠিন করতে পারে, কিন্তু অধ্যবসায়, সততা ও মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা সাফল্যের পথ খুলে দেয়।
তিনি বলেন, শিক্ষকতা আমার কাছে শুধু একটি পেশা নয়; এটি প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিই আজ আমাকে এনে দিয়েছে জাতীয় সম্মান।
নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সাধারণ সম্পাদক তানভীর জাহান চৌধুরী বলেন, অধ্যাপক আবু তাহের নেত্রকোনার উচ্চশিক্ষার দিগন্ত প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করছেন। তার সততা, নিয়মানুবর্তিতা ও প্রজ্ঞা একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। তার মতো গুণী ও সৎ শিক্ষকের সুযোগ্য নেতৃত্বেই নেত্রকোনা সরকারি কলেজ আগামী দিনে দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে—এটাই জেলাবাসীর প্রত্যাশা।