ছাত্রদলসহ পাঁচটি প্যানেলের ভোট বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন। গতকাল বৃহস্পতিবার ৩৩ বছর পর আয়োজিত এ কর্মযজ্ঞ প্রাণহীন হয়ে পড়ে জাল ভোট প্রদান, হট্টগোল, অসংগতি এবং ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবস্থানসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর। এসব কারণে একাধিক কেন্দ্রে কিছু সময়ের জন্য ভোটগ্রহণ স্থগিতও রাখতে হয়।
নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসিসহ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ওঠে। এমনকি ভোটগ্রহণের শেষ দিকে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ এনে বিএনপিপন্থি তিন শিক্ষকও নির্বাচনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। এর পরও উল্লেখযোগ্য ৬৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ ভোট পড়ে। তবে পুনর্নির্বাচনের দাবি তোলেন ভোট বর্জনকারীরা।
গতকাল সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সময় শেষ হলেও ভোটারদের উপস্থিতির কারণে বেশ কয়েকটি হলের কেন্দ্রে ৫টার পরও ভোট নেওয়া হয়। ২১ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হলেও সবগুলো কেন্দ্রের ভোট এক স্থানে জড়ো করে গণনা করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ আবাসিক হলে স্থাপিত ২১ কেন্দ্রের ২২৪ বুথে ভোট হয়। এর মধ্যে ১১টিতে ছাত্ররা এবং ১০ কেন্দ্রে ছাত্রীরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। জাকসুতে ২৫ পদের বিপরীতে ১৭৯ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। অপরদিকে ২১ হল সংসদের ৩১৫ পদে লড়েন ৪৬৭ জন। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১১ হাজার ৯১৯ জন। এর মধ্যে ছাত্র ছয় হাজার ১০২ এবং ছাত্রী পাঁচ হাজার ৮১৭ জন। নির্বাচনে ছাত্রদল, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস), ইসলামী ছাত্রশিবির, বামপন্থি সংগঠন ও স্বতন্ত্রসহ আট প্যানেলের মধ্যে লড়াই হয়। এতে সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রার্থী ১০ জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ৯ জন, নারী যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ছয়জন, পুরুষ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ১০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের আসাসিক এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। আগে থেকেই বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। গতকাল ভোটের দিন ক্যাস্পাসে প্রবেশের ১২টি গেটে কড়াকড়ি ছিল। বৈধ শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র যাচাই করে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। নিরাপত্তা রক্ষায় এক হাজার ২০০ পুলিশ সদস্য ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় এক হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। এর বাইরে ক্যাম্পাসে র্যাব ও বিজিবি সদস্যদের তৎপরতা ছিল লক্ষণীয়। বিভিন্ন স্থানে সাদা পোশাকধারী পুলিশের বেশ নজরদারি ছিল।
সকালে জাকসু নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন অভিযোগ উঠতে থাকে। বিশেষ করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করা হয়। এমনকি একাধিক কেন্দ্রে ভোটগ্রহণও কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকে। ছাত্রী হলগুলোয় সাংবাদিক প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। এ বাধার জের ধরে প্রার্থীরা মেয়েদের হলগুলোয় জাল ভোট দেওয়ারও অভিযোগ তোলেন। তাছাড়া ভোটের আগের রাতেই অভিযোগ ওঠে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের এক নেতাকে ব্যালট বাক্স নেওয়ার সময় দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা যায়।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী না হওয়া সত্ত্বেও রাতে হলে অবস্থানের কারণে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় এক নেতাকে ভোটগ্রহণকালে আটক করা হয়। ভোটার সংখ্যার অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানো ও তা কেন্দ্রে সরবরাহেরও অভিযোগ ওঠে। এছাড়া ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, জামায়াতে ইসলামী নেতার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যালট পেপার ছাপানো হয়েছে এবং জামায়াত নেতার প্রতিষ্ঠানকে সিসিটিভির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অবশ্য শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, যে প্রতিষ্ঠান ব্যালট পেপার ছাপিয়েছে তার মালিক জামায়াত নয়, বিএনপি নেতা। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার ফেসবুক ওয়ালে খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির বিভিন্ন নেতার ছবি আছে বলে শিবিরের দাবি।
কোন হলে কত ভোট পড়ল
নির্বাচনে আল বেরুনী হলে ২১১ ভোটের মধ্যে ১২৫, আ ফ ম কামাল উদ্দিন হলে ৩৪১ ভোটের মধ্যে ২১৬, মীর মশাররফ হোসেন হলে ৪৮৭ ভোটের মধ্যে ৩১০, নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলে ২৮৭ ভোটের মধ্যে ১৩৮, শহীদ সালাম-বরকত হলে ৩০৩ ভোটের মধ্যে ২২৪, মাওলানা ভাসানী হলে ৫২১ ভোটের মধ্যে ৩৮৪, জাহানারা ইমাম হলে ৪০২ ভোটের মধ্যে ২৪৭, প্রীতিলতা হলে ৪০২ ভোটের মধ্যে ২৫০, বেগম খালেদা জিয়া হলে ৪১৭ ভোটের মধ্যে ২৪৯, ১০ নম্বর (ছাত্র) হলে ৫৪১ ভোটের মধ্যে ৩৮১, শহীদ রফিক-জব্বার হলে ৬৫৬ ভোটের মধ্যে ৪৭০, বেগম সুফিয়া কামাল হলে ৪৬০ ভোটের মধ্যে ২৪৬, ১৩ নম্বর (ছাত্রী) হলে ৫৩২ ভোটের মধ্যে ২৯২, ১৫ নম্বর (ছাত্রী) হলে ৫৭৭ ভোটের মধ্যে ৩৫০, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে ৩৫৮ ভোটের মধ্যে ২৬১, রোকেয়া হলে ৯৫৭ ভোটের মধ্যে ৬৮০, ফজিলাতুন্নেছা হলে ৮০৯ ভোটের মধ্যে ৪৮৯, বীর প্রতীক তারামন বিবি হলে ৯৮৩ ভোটের মধ্যে ৫৯৫, ২১ নম্বর (ছাত্র) হলে ৭৪৬ ভোটের মধ্যে ৫৬০, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলে ৯৯৩ ভোটের মধ্যে ৮১০ এবং শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলে ৯১৪ ভোটের মধ্যে ৭৫২ ভোট কাস্ট হয়।
কবি নজরুল হলের ব্যালটে ত্রুটি
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল সংসদ নির্বাচনে ব্যালট পেপারে ত্রুটির অভিযোগ পাওয়া যায়। ভোটগ্রহণ চলাকালে ব্যালট পেপারে নির্বাহী সদস্যপদে ভোট দেওয়ার নির্দেশনা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ব্যালটে উল্লেখ করা হয়Ñএকজন প্রার্থীর নামের পাশে টিকচিহ্ন দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে নির্বাহী কমিটির তিনটি সদস্যপদ থাকায় শিক্ষার্থীদের তিনজন প্রার্থীর নামের পাশে টিকচিহ্ন দেওয়ার কথা। পরে ভোটারদের ভুল এড়াতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ভোটগ্রহণ বন্ধ
নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে দুটি হলে ভোটগ্রহণ সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা না থাকা এবং অমোচনীয় কালি না দেওয়ার অভিযোগ এনে দুপুর ১২টার দিকে শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ হলে দুই দফা এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলে ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় হল প্রোভস্টের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কথা কাটাকাটি হতে দেখা যায়। পরে ছবিসহ ভোটার তালিকা সংযুক্ত করার পর আবার ভোটগ্রহণ শুরু হয়। তাজউদ্দীন আহমদ হলে আবার এক দফা ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল।
ছাত্রদলের ভোট বর্জন
ভোটগ্রহণে অসংগতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে জাকসু নির্বাচন বর্জন করে ছাত্রদল। নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন সংগঠনটি সমর্থিত প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী তানজিলা হোসাইন (বৈশাখী)। গতকাল বেলা সাড়ে ৩টার দিকে মওলানা ভাসানী হলের অতিথি কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি এ ঘোষণা দেন।
তানজিলা অভিযোগ করেন, ভোট দেওয়ার সময় ফজিলাতুন্নেছা হলে আঙুলে দেওয়া কালি মুছে যাচ্ছিল। একটি ব্যালট ফ্লোরে পাওয়া গেছে। এসব কারণে দুই ঘণ্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ ছিল। এছাড়া একটি হলে তাদের ভিপি প্রার্থীকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তাজউদ্দীন আহমদ হলে ভোটার লিস্টে ছবি না থাকায় ভোট বন্ধ ছিল। জামায়াত নেতার প্রতিষ্ঠান থেকে ছাপানো ব্যালটে ভোট হচ্ছে। সব হলে ছাত্রদলের প্যানেলের এজেন্টদের থাকতে দেওয়া হয়নি।
অতিরিক্ত ব্যালট ছাপার বিষয়ে প্রশ্ন তুলে তানজিলা বলেন, হলগুলোয় আমাদের প্রার্থী ও এজেন্টদের বাধা দিয়ে ওই জাল ব্যালট দিয়ে ভোট কাস্ট করা হচ্ছে কি না? এসব ঘটনা প্রমাণ করে টোটালি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন হচ্ছে না। এটি একটি পরিপূর্ণ কারচুপির নির্বাচন, প্রহসনের নির্বাচন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে এক হয়ে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যবস্থা করেছেÑএমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, জামায়াত নেতার প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যালট ছাপানো হয়েছে। জামায়াতের সরবরাহ করা ব্যালটে ফেয়ার ইলেকশন হচ্ছে না। ভোটকেন্দ্রগুলো মনিটরিংয়ে জামায়াত নেতার কোম্পানিকেই সিসিটিভির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিবিরকে পুরো ভোটকেন্দ্রগুলো মনিটর করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এ নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের সত্যিকার রায়ের প্রতিফলন ঘটছে না। এসবের প্রতিবাদে আমরা নির্বাচন বর্জন করতে বাধ্য হচ্ছি।
এ সময় প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী শেখ সাদী হাসানসহ ছাত্রদলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচন বর্জন করে পুনর্নির্বাচন চাইল বামদের চার প্যানেল
জাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করেছে বাম শিক্ষার্থীদের চারটি প্যানেল। এগুলো হলোÑছাত্র ইউনিয়ন (অদ্রি-অর্ক), সাংস্কৃতিক জোট ও ইন্ডেজেনাস স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেল; ছাত্র ইউনিয়ন (ইমন-তানজিম) ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ‘সংশপ্তক পর্ষদ’; স্বতন্ত্র শিক্ষার্থীদের প্যানেল ‘স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ’ এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী) প্যানেল। তারা দ্রুত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় পুনর্নির্বাচনের দাবি জানায়।
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেক পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সপোর্ট চত্বরে চারটি প্যানেলের পক্ষ থেকে সম্প্রীতির ঐক্য ফোরামের জিএস প্রার্থী শরণ এহসান এ ঘোষণা দেন। এর আগে সংশপ্তক পর্ষদ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাদের প্যানেলের ভোট বর্জনের কথা জানায়।
সংবাদ সম্মেলনে শরণ এহসান বলেন, নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা, অব্যবস্থাপনা ও অথর্বতা সমগ্র নির্বাচনের ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমরা বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ করেছি এই নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ অসহযোগিতা, পক্ষপাতদুষ্ট ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে চূড়ান্ত অনিচ্ছা রয়েছে।
তিনি বলেন, পোলিং এজেন্টদের কাজ করতে না দেওয়া, নারী হলে পুরুষ প্রার্থী প্রবেশ, ভোটার লিস্টে ছবি না থাকা, আঙুলে কালির দাগ না দেওয়া, ভোটার হওয়ার পরও তালিকায় নাম না থাকা, ভোটারের তুলনায় ব্যালট বেশি ছাপানো, লাইন জ্যামিং, বহিরাগতদের আনাগোনা প্রভৃতি অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির কারণে এই নির্বাচন ঘিরে অনেক সন্দেহ আর প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই দায় কেবল এবং কেবলমাত্র ব্যর্থ, অথর্ব ও পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন আর প্রশাসনের। এ নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াতেই ক্রেডিবিলিটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একটি সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় জাকসু নির্বাচন আমাদের আজীবনের দাবি। আমরা এই অনিয়মের নির্বাচন বয়কট করেছি এবং দ্রুত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় পুনর্নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছি।
লিখিত বক্তব্যে নির্বাচনের অব্যবস্থাপনা তুলে ধরে প্রথম দুই ঘণ্টায় কোনো পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেওয়া, ভোট নিশ্চিতকারী আঙুলে কালি না দেওয়া, ভোটকেন্দ্রে ছাত্রশিবিরের লিফলেট বিলি, কেন্দ্রে অতিরিক্ত ব্যালট পেপার পাঠানো, নারী হলে পুরুষ প্রার্থী প্রবেশ, ভোটার লিস্টে ছবি না থাকা, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের আনাগোনাসহ অনেক অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা আর গাফিলতির অভিযোগ করা হয়।
নির্বাচনি দায়িত্ব পালন থেকে সরে দাঁড়ান বিএনপিপন্থি তিন শিক্ষক
জাকসু নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন জাবির বিএনপিপন্থি তিন শিক্ষক। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আধঘণ্টা আগে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে নির্বাচন কমিশনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে তারা এ ঘোষণা দেন। এর আগে বেলা সাড়ে ৩টায় ছাত্রদল নির্বাচন বর্জন করে। ওই তিন শিক্ষক হলেনÑঅধ্যাপক নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক শামীমা সুলতানা ও নাহরিন ইসলাম খান। তাদের মধ্যে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম কেন্দ্রীয়ভাবে জাকসু নির্বাচন মনিটরিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। অপর দুজন হল পর্যায়ে ভোট মনিটরিং করছিলেন।
ভোটকেন্দ্রে ছাত্রদল নেতা ও সাবেক শিক্ষার্থী
ভোট চলাকালে ভোটকেন্দ্র বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলে অবস্থান করছিলেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান সোহান। তাকে প্রক্টরের কাছে হস্তান্তর করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরে মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ছাত্রদলের বর্জন একান্ত নিজস্ব, ভোট সুষ্ঠু হয়েছেÑস্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী জিতু
ছাত্রদলের ভোট বর্জনকে একান্ত নিজস্ব সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতু। তিনি বলেন, পরাজয়বরণ করার সাহসী মনোভাব ছাত্রদলের নেই। ছাত্রদলের নির্বাচন বর্জনকে শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে নিচ্ছেন না। ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে কথায় কথায় নির্বাচন বর্জন করা নির্বাচনি পরিবেশ ব্যাহত করছে। আমরা মনে করি, কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। এ নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা যে রায় দেবেন, তা আমরা মাথা পেতে মেনে নেব।
তিনি বলেন, আমরা দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি বন্ধ চাই। অতীতে দেখেছি লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতিচর্চার কারণে আমাদের একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। আমরা লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি ছেড়ে শিক্ষার্থীবান্ধব গঠনমূলক রাজনীতি চাই। শিক্ষার্থীদের স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস হবে না।
নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ৩৩ বছর পর নির্বাচন হচ্ছে। এতদিন পর নির্বাচন করতে গিয়ে প্রশাসনকে জটিলতা কাটিয়ে ওঠা চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে আমরা মনে করি এই নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অধিকার বাস্তবায়িত হচ্ছে।
অনিয়মের অভিযোগ শিবিরেরও
নির্বাচনে ব্যাপক অসংগতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট। বেলা ২টার দিকে প্রক্টর অফিসের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আরিফ উল্লাহ বলেন, বুধবার থেকে দেখতে পেয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন কমিশন ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনারের প্রস্তুতির ঘাটতি আছে উল্লেখ করে আরিফ উল্লাহ বলেন, বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে দিতে গড়িমসি করা হয়। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্ট ও হলে সাবেক ছাত্রদল নেতাকর্মীদের দেখা গেছে। তারা ভোটারদের বিভিন্নভাবে ম্যানিপুলেট (প্রভাবিত) করার চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে বারবার বলা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জাকসু নির্বাচনে অতিরিক্ত ব্যালট ছাপানো প্রসঙ্গে এই ভিপি প্রার্থী বলেন, আমরা অতিরিক্ত ১০ শতাংশ ব্যালট পেপার ছাপানোর তথ্য জানতে পেরে তা সিলগালা করে ভোটারসংখ্যার সমান ব্যালট পেপার দিতে বলেছিলাম। কিন্তু অধিকাংশ হলে অতিরিক্ত ব্যালট পেপার পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন হলে ছাত্রদল নিজেদের প্যানেলের সদস্যদের ভোট দেওয়ার জন্য ভয়ভীতি দেখাচ্ছে অভিযোগ তুলে শিবির সমর্থিত এই ভিপি প্রার্থী বলেন, বিভিন্ন হলে দল বেঁধে গিয়ে ছাত্রদল ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছে। তারা জাহানারা ইমাম হলে ঢুকে গার্ডকে মারধর করেছে। একটি হলে সরাসরি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে মব তৈরি করে ভোট বানচালের চেষ্টা করেছে।
আরিফ উল্লাহ আরো বলেন, আমাদের ক্যাম্পাসের চারপাশে ছাত্রদলের বহিরাগতদের বেশি আনাগোনা লক্ষ করা গেছে। বিষয়টি আমাদের মধ্যে অনেক বেশি আশঙ্কা তৈরি করেছে। এভাবে হলে তো যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
জামায়াতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে ওএমআর ও ব্যালট পেপার ছাপানোর অভিযোগের বিষয়ে আরিফ উল্লাহ বলেন, এইচআরসফটবিডি নামের যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রোকমুনুর জামান বিএনপির সমর্থক। তার ফেসবুক ওয়ালে খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, বিএনপির আইনজীবী সানাউল্লাহ, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন নেতার ছবি দেখা যায়।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন আমার দেশ-এর স্টাফ রিপোর্টার আজাদুল আদনান, নজমুল হুদা শাহীন, ইমরান হোসাইন ও মাহির কাইয়ুম]