রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) মেয়াদ শেষ হলেও আলোর মুখ দেখেনি সিনেট অধিবেশন। নির্বাচনের এক বছর পেরিয়ে গেলেও শপথ হয়নি সিনেটের পাঁচ ছাত্র প্রতিনিধির। আইন অনুযায়ী বছরে অন্তত একবার অধিবেশন ডাকার বিধান থাকলেও প্রায় এক দশক ধরে অকার্যকর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ এই নীতিনির্ধারণী ফোরাম।
দীর্ঘ ৩৫ বছরের অচলাবস্থা কাটিয়ে গত বছরের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় রাকসু নির্বাচন। এ সময় রাবি সিনেটের পাঁচ প্রতিনিধিকেও নির্বাচিত করেন শিক্ষার্থীরা। সিনেটের কোরাম সংকট, সদস্যপদ বিষয়ে জটিলতা ও প্রশাসনের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে ঝুলে আছে অধিবেশন আয়োজন। দেশের অন্য তিন স্বায়ত্তশাসিত ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতি বছর সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হলেও সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম রাবি। এতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
বহুল প্রতীক্ষিত ওই নির্বাচনে সিনেট প্রতিনিধি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ৫৮ প্রার্থী। নির্বাচনে শিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ থেকে তিনজন এবং স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে দুজন নির্বাচিত হন। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা হলেন—রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বির, ফজলে রাব্বী মো. ফাহিম রেজা এবং আকিল বিন তালেব।
রাবির আইন অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান নির্বাচিতরা সিনেট প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হবেন। এছাড়া শপথ গ্রহণের পরবর্তী এক বছর পর্যন্ত তারা দায়িত্ব পালন করবেন।
১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী বছরে অন্তত একবার সিনেট অধিবেশন ডাকার বিধান রয়েছে। কিন্তু রাবিতে সবশেষ সিনেট অধিবেশন হয় ২০১৬ সালের ১৯ মে। এর আগে ২০০১ সালের ২৮ ও ২৯ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম সিনেট অধিবেশনের পর দীর্ঘ ১৪ বছর বিরতি দিয়ে ২০১৫ সালের ১৮ মে ২১তম অধিবেশন হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী এই ফোরামে উপাচার্য নির্বাচন, বাজেট অনুমোদন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সংশোধন এবং নতুন বিভাগ বা ইনস্টিটিউট চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জানতে চাইলে সিনেটের ছাত্র প্রতিনিধি ফাহিম রেজা বলেন, ‘গত এক বছরে আমরা দুটি প্রশাসন পেয়েছি। উভয় প্রশাসনই সিনেট কার্যকর করা নিয়ে উদাসীন। শুধু আশ্বাস দেওয়া পর্যন্তই তাদের কাজ সীমাবদ্ধ। আমরা আশা করেছিলাম কোনো ধরনের আন্দোলন-সংগ্রাম ছাড়া সমঝোতার মাধ্যমে সিনেট অধিবেশন পাব। কিন্তু প্রশাসনের কোনো সদিচ্ছা দেখিনি। আমরা নির্বাচিত পাঁচজন বিভিন্ন আলোচনা করেছি। তিনজন রাকসু সদস্য হওয়ায় এত দিন সিনেট নিয়ে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারছিল না। আমরা শিগগির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে যাব।’
রাকসুর জিএস ও সিনেট প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘সিনেট কার্যকর করার জন্য প্রশাসনের সঙ্গে বারবার কথা বলেছি। বর্তমান প্রশাসন আমাদের কাছে এক মাসের মতো সময় চেয়েছে। আমরা একটি বড় সীমাবদ্ধতার কথা জানি যে, সিনেটে আওয়ামী আমলের অনেক সদস্য আছেন। তাদের না নিয়ে অধিবেশন ডাকলে তারা আবার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে সেই সিনেট অধিবেশন বাতিল করে দিতে পারবেন। তবে এগুলো চাইলেই সমাধান করা সম্ভব। প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট আন্তরিক নয়। যেভাবেই হোক, আমরা সিনেট কার্যকর করব।’
রাকসুর ভিপি ও সিনেট সদস্য জাহিদ বলেন, ‘রাকসুর প্যানেলের মধ্যে আমরা তিনজন সিনেট সদস্য থাকায় আমরা প্রতিটি অধিবেশনেই সিনেট নিয়ে কথা বলেছি। এছাড়া আমরা আলাদাভাবে অসংখ্যবার প্রশাসনের সঙ্গে দেখা করেছি। দুই প্রশাসনই আমাদের বিভিন্ন কারণ দেখিয়েছে। আমার মনে হয়, প্রশাসন সিনেট অধিবেশন না দেওয়ার মূল কারণ সিনেটে যেসব সিদ্ধান্ত হয়, এগুলো তারা মেনে নিতে পারবে না। প্রশাসন সেগুলোকে অনধিকার চর্চা মনে করবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সিনেটের শপথ ও পরবর্তী রাকসু নিয়ে প্রশাসন সর্বোচ্চ ইগনোরেন্স দেখিয়েছে। সিনেট নিয়ে আমরা খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত জানাব।’
এ বিষয়ে রাবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, ‘আমি চেষ্টা করছিলাম সিনেট অধিবেশন দেওয়ার জন্য। প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো হালনাগাদ করার জন্য বলেছিলাম। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সময় লাগছিল। এরপর তো আমার মেয়াদ শেষ হয়ে গেল।’
জানতে চাইলে রাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি সিনেট অধিবেশন দেওয়ার জন্য। কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বিষয়গুলো সম্পর্কে জানেন। সিনেট অধিবেশন করতে গেলে আগে কোরাম পূরণ করতে হবে। অনেক সিনেট সদস্য মৃত্যুবরণ করেছেন, বিভিন্ন কারণে অনেক পদ শূন্য হয়ে আছে। এসব ইস্যু সমাধান হওয়ার পর সিনেট অধিবেশন ডাকব। যখন বুঝব বিতর্কহীনভাবে অধিবেশন করতে পারব, তখনই করব। তার আগে আমি করব না।’