তাপপ্রবাহের মধ্যেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে চলছে যথারীতি ক্লাস-পরীক্ষা। অন্যান্য বছর তাপপ্রবাহের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রীষ্মকালীন ছুটি ঘোষণা করলেও এবার তা করা হয়নি। ফলে তাপপ্রবাহের মধ্যে প্রচণ্ড গরমের কারণে শ্রেণিকক্ষে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশুরা।
বৃহস্পতিবার কুমিল্লার মক্রবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমেনা আক্তার (৮) ৩য় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী প্রচণ্ড গরম সহ্য করতে না পেরে শ্রেণিকক্ষেই জ্ঞান হারায়। পরে তাকে জরুরি ভিত্তিতে নাঙ্গলকোট সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
বিকেলে অসুস্থ শিক্ষার্থীর মা ফয়জুন নেসা আমার দেশকে বলেন, সকালে সুস্থ মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফোন আসে। তড়িঘড়ি করে স্কুলে গিয়ে দেখি আমার মেয়ে অজ্ঞান হয়ে প্রধান শিক্ষকের রুমে ফ্লোরে শুয়ে আছে। সবাই তাকে হাত পাখায় বাতাস দিচ্ছেন এবং তাকে মাথায় পানি দেওয়া হচ্ছে। পরে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বাচ্চাকে বাসায় নিয়ে এসেছি; সে এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেনি।
তিনি আরো বলেন, একদিকে তাপপ্রবাহে তীব্র গরম, অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে বাচ্চা স্কুলে গিয়ে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
ওই স্কুলের সহকারী শিক্ষক শফিকুর রহমান আমার দেশকে বলেন, গতকাল সকালে প্রচণ্ড গরমের কারণে ৩য় শ্রেণির শিক্ষার্থী আমেনা আক্তার অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে নাঙ্গলকোট সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তার অবস্থা ভালো এবং অভিভাবক তাকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে গেছে।
জালগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মহিব বুল্লাহ বলেন, তীব্র গরমে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। অসহনীয় তাপমাত্রায় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যত দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে। বিদ্যালয় চলাকালীন নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যানও বন্ধ থাকে। ঘামে ভিজে শিশুরা ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না।
তিনি আরো বলেন, অনেক শিক্ষার্থী মাথা ঘোরা, বমি ও দুর্বলতায় ভুগছে। শিক্ষকরাও চরম অস্বস্তির মধ্যে পাঠদান করতে বাধ্য হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। এ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। তাই দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উপযুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে চলমান তাপপ্রবাহের মধ্যে স্কুল ছুটি না দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকেরা। তারা বলছেন, শিশুদের কথা বিবেচনা করে অন্যান্য বছরের মতো সরকার স্কুল ছুটি ঘোষণা করতে পারতো।
আজ সকালে রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলের গেটে দেখা যায়, অভিভাবকরা তাদের সন্তান পৌঁছে দিচ্ছেন; সঙ্গে দিয়ে দিচ্ছেন পানি ও জুস। একই সঙ্গে গরমে সুস্থ থাকতে দিয়েছেন নানা উপদেশ। আবার তাপপ্রবাহে ক্লাসের বাইরে বের না হতে, মাঠে খেলাধুলা না করতে এমনকি বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি না করার জন্যও সতর্ক করেছেন তারা।
তীব্র গরমের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার পক্ষে না অনেক অভিভাবক। তাদের শঙ্কা, বাচ্চারা স্কুলে গিয়ে গরমের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। আর শিক্ষকরা বলছেন, গরমে শিশুদের অস্থিরতা ধরা পড়ছে ক্লাসরুমে। অনেকে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
এদিকে প্রচণ্ড গরমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি পরিবর্তন করে বেলা ১২টার মধ্যে বিরতিহীনভাবে ক্লাস চালানোর আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি।
গত সোমবার সমিতির পক্ষ থেকে এক বিবৃতির মাধ্যমে এ আহ্বান জানান সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সিদ্দিকুর রহমান।
বিবৃতিতে তিনি জানিয়েছেন, প্রচণ্ড তাপদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত। এমতাবস্থায় শিশুদের তাপের প্রচণ্ডতা বৃদ্ধির আগেই বিদ্যালয়ে গমনের বিষয়টি জরুরিভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের তুলনায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিখন ঘাটতি অতি নগণ্য। জানুয়ারি মাসে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যথাযথভাবে শ্রেণির কার্যক্রম হয়েছে। যা মাধ্যমিকে অনেক বিদ্যালয়ে হয়নি। এসএসসি পরীক্ষার সেন্টারগুলোতে শিখন ঘাটতি ব্যাপক। শিখন ঘাটতির এ ব্যাপকতা রোধের জন্য বিদ্যালয় বন্ধের দিনগুলোতে পরীক্ষা নেওয়ার আহ্বান রইলো। প্রাথমিকের শিখন ঘাটতির অন্যতম কারণ দরিদ্র, অশিক্ষিত ও অসচেতন অভিভাবক। আশাকরি বিষয়টি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ভাববেন। প্রচণ্ড গরমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদানের সময়সূচি দুপুর ১২টার মধ্যে বিরতিহীনভাবে সমাপ্ত করার আহ্বান রইলো।
এ পরিস্থিতিতে ক্লাসের সময়সূচি পরিবর্তন কিংবা ছুটি ঘোষণার কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা এ বিষয়ে জানতে আজ বৃহস্পতিবার বিকালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মিরাজুল ইসলাম উকিলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার দেশকে বলেন, এটা সরকারের পলিসির বিষয়; তাই এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না।
পরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।