চাকসু নির্বাচন
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (চাকসু) নির্বাচনে শহরে বসবাসরত ১৬ হাজার অনাবাসিক শিক্ষার্থীর ভোটকেন্দ্রে আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থী থাকেন চট্টগ্রাম নগরীতে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে থাকা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভোট দিতে ক্যাম্পাসে আসবেন কীনা, সেটি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। সচেতন মহলের আশঙ্কা, শহরের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে না এলে নির্বাচনের ফলাফল একপেশে ও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। সেজন্য অনেকে চট্টগ্রাম নগরীতে ভোটের বুথ বসানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট হল রয়েছে ১৫টি। এর মধ্যে ছেলেদের ১০ ও মেয়েদের জন্য ৫টি হল। ছেলেদের হলগুলোতে মোট আসন সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার এবং মেয়েদের হলে আসন প্রায় আড়াই হাজার। সে হিসেবে হলগুলোতে ৭ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন। এছাড়া আশপাশে বিভিন্ন কটেজ ও বাসায় থাকেন আরো ৩-৪ হাজার শিক্ষার্থী। বাকি শিক্ষার্থীরা থাকেন চট্টগ্রাম শহরে।
অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের অনেকেই মনে করেন, নগর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ভোট দেওয়া কষ্টসাধ্য। ক্যাম্পাসে গেলে পুরো দিন নষ্ট হয়ে যায়, তাছাড়া যাতায়াত খরচ ও ঝক্কিঝামেলাতো আছেই।
চকবাজারে একটি মেসে থাকা বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সোহেল রানা বলেন, ভোট দেওয়ার জন্য যদি ক্যাম্পাসে যেতে হয়, তাহলে সারাদিনই শেষ হয়ে যাবে। সকাল থেকে শাটল ট্রেন বা বাসে ভিড় থাকে, ফিরতেও ঝামেলা পোহাতে হয়। এসব কারণে অনেকেই হয়ত ভোট দিতে যেতে চাইবেন না।
একই মতপ্রকাশ করেন সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অনাবাসিক ছাত্রী তানিয়া আক্তার। তিনি বলেন, দূরত্বের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন যাওয়া সম্ভব হয় না। ভোটের দিনও যদি এত দূরে গিয়ে ভোট দিতে হয়, তাহলে অনেকেই ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। শহরে বুথ থাকলে আমরা সহজেই ভোট দিতে পারতাম।
অন্যদিকে, আবাসিক শিক্ষার্থীরা শহরে বুথ স্থাপনের প্রস্তাবকে সঠিক মনে করছেন না। আলাওল হলের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, চাকসুর নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক। শহরে বুথ হলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সুযোগ তৈরি হবে, কারচুপির ঝুঁকি থাকবে। হলে থাকা শিক্ষার্থীরা সব সময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থাকেন, তাই তাদের জন্য ভোট দেওয়া কঠিন কিছু নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবশ্য স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, শহরে বুথ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একজন নির্বাচনি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চাকসুর সংবিধান অনুযায়ী ভোটকেন্দ্র কেবল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই থাকবে। শহরে বুথ হলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন যে, নগরে থাকা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কম হলে ফলাফলে একপেশে ভাব চলে আসবে। যা নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে পারে।
জানতে চাইলে চাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. কেএম আরিফুল হক সিদ্দিকী বলেন, আমরা ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছি। এখন আমরা চূড়ান্ত ভোটার তালিকা এবং মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমা ইত্যাদি নিয়ে কাজ করছি। প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর আমরা ভোট কেন্দ্র কোথায় কোথায় হবে, সেটা মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিব।
এই পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন বিশেষজ্ঞরাও। তারা মনে করছেন, অনাবাসিক শিক্ষার্থীরাই এখানে বড় ফ্যাক্টর। ১৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী যদি ভোটে না আসেন, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল শুধু আবাসিক শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভর করবে। এতে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। প্রশাসনের উচিত নগর থেকে শিক্ষার্থীদের আনতে বিশেষ শাটল ট্রেন, বাস কিংবা অতিরিক্ত পরিবহনের ব্যবস্থা করা, যাতে ভোটের হার বাড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, শহরে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করলে ঝামেলা হতে পারে। ভোট কারচুপির সুযোগ তৈরি হবে। তাই ক্যাম্পাসেই ভোট আয়োজন করতে হবে। তবে শিক্ষার্থীদের শহর থেকে ক্যাম্পাসে আনতে পর্যাপ্ত যানবাহনের ব্যবস্থা করতে পারে প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, নির্বাচন তো অনেক পরের ধাপ। পর্যায়ক্রমে ওটা আসবে। তবে তার আগে দলকানা রেজিস্ট্রার, প্রক্টর এবং চাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিবকে বদলাতে হবে। তারপর নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিতে হবে।
শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ইফাজ উদ্দিন বলেন, শহরে চাকসু নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রের বুথ স্থাপন আমরা যৌক্তিক মনে করি না। শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন শহর থেকে ক্যাম্পাসে এসে ক্লাস করতে পারে। নির্বাচনের দিন ভোটও দিতে পারবে। তবে আমরা নির্বাচনের দিন শাটল ট্রেনের শিডিউল বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত বাসের ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আগামী ১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন।