জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পার হলেও গণহত্যায় সমর্থন জোগানো জবির আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের বিচার হয়নি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শিক্ষকরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এখনো অনেকেই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে ফেরানোর চক্রান্তে লিপ্ত।
এছাড়া ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে নীল দলের ব্যানারে ক্যাম্পাসে রামরাজত্ব কায়েম
করেছিলেন তারা। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনিয়মে সম্পৃক্ত থাকলেও তারা রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত সাত শতাধিক শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন, যাদের বেশিরভাগেরই প্রধান যোগ্যতা ছিল ছাত্রলীগের ক্যাডার হওয়া বা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা।
সাবেক উপাচার্য যুবলীগ ক্যাডার মীজানুর রহমান আট বছরে একাই চার শতাধিক শিক্ষক নিয়োগ দেন, যাদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের অনুসারী। এদের বড় অংশ কুমিল্লা-নোয়াখালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়োগ পান।
পরবর্তী উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইমদাদুল হকের আমলেও আওয়ামী লীগের আরেকাংশ নিয়োগসহ প্রশাসনিক সুবিধা বাগিয়ে নেয়। তার মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেওয়া ড. সাদেকা হালিমের সময়েও একাধিক আওয়ামীপন্থি শিক্ষক সুবিধা আদায় করেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রথমবার জবির নিজস্ব শিক্ষকদের মধ্য থেকে উপাচার্য হন অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম। কিন্তু ততদিনে সাত শতাধিক দলীয় ও এলাকা কোটার নিয়োগ সম্পন্ন হয়ে গেছে।
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীনের সময় নতুন নিয়োগ না হলেও অভিযোগ রয়েছে, নীল দলের একাংশের প্রশ্রয়ে অভিযুক্তরা বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন না। আওয়ামী শাসনামলে নীল দলের সভাপতি-সম্পাদকরাই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারক। হাসিনার পতনের পর অনেকে আত্মগোপন করেন। কেউ কেউ বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০১১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি নীল দলের প্রথম আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। এতে ড. আলী নূর সভাপতি এবং ড. নূরুল মোমেন সদস্য সচিব হন। আওয়ামী লীগের প্রভাবে আলী নূর বিইউবিটিতে উপউপাচার্য হন। বর্তমানে তিনি জবিতে বিজনেস অনুষদের ডিন ও ক্রীড়া কমিটির আহ্বায়কসহ একাধিক দায়িত্বে আছেন। ফ্যাসিবাদী আমলে তিনি প্রভাবশালী ভূমিকা রাখেন। সরকার পরিবর্তনের পরও তার প্রভাব কমেনি।
২০১৪-১৫ মেয়াদে ড. মোহাম্মাদ সেলিম সভাপতি এবং অধ্যাপক রেজাউল করীম নীল দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেলিম এখনো জবিতে কর্মরত। তিনি চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ৪ আগস্ট শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে মানববন্ধনে বক্তব্য দেন। শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট হাসিনার পক্ষে ছিলেন তিনি। একই সময়ে জবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন ড. সরকার আলী আক্কাস। তিনি প্রভাব খাটিয়ে টানা পঞ্চমবার বিভাগীয় চেয়ারম্যান এবং নিয়ম ভেঙে তিনবার ডিন হন। একসঙ্গে একাধিক দায়িত্বের ভাতা নেন। অবন্তিকার আত্মহত্যায় দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।
২০১৫-১৬ সেশনে একেএম মনিরুজ্জামান সভাপতি এবং একেএম লুৎফর রহমান সম্পাদক নির্বাচিত হন। ফ্যাসিস্টের দোসর মনিরুজ্জামান এখনো ফেসবুকে সক্রিয় থেকে গুজব ছড়ান এবং জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে ক্রমাগত পোস্ট দেন। লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করে শিক্ষকদের সংগঠিত করার অভিযোগ আছে। সম্প্রতি জবিতে তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
২০১৬-১৭ সেশনের সভাপতি কাজী সাইফুদ্দিন প্রভাব খাটিয়ে পিরোজপুরের বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হন। চাকরি দেওয়ার নামে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং হেকেপ তহবিল তছরুপের অভিযোগও উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে জবিতে তিনি মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেশনাল প্রোগ্রামের পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন।
বিভক্তি ও সমান্তরাল কমিটি
২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নীল দল একক থাকলেও ২০১৭ সালে গঠনতন্ত্র ভেঙে মীজানপন্থি একাংশ পৃথক কমিটি গঠন করে, যার সভাপতি ড. অরুণ কুমার গোস্বামী এবং সম্পাদক আবদুল্লাহ-আল মাসুদ। পিএইচডি ও পর্যাপ্ত গবেষণা না থাকা সত্ত্বেও উপাচার্যের আস্থাভাজন হয়ে অধ্যাপক হন মাসুদ। পাশাপাশি ২০১৭-২০২২ মেয়াদে পরিবহন প্রশাসক থাকাকালে অর্থ আত্মসাৎ ও তেল চুরির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
এরপর দুই ধারায় চলতে থাকে নীল দল। ২০১৭-১৮ সেশনে একাংশের সভাপতি ছিলেন মনিরুজ্জামান ও সম্পাদক ড. নাসির উদ্দীন। হাইকোর্টের আদেশে এখন বিভাগে কর্মরত নাসির। ২০১৮-১৯ সেশনে একাংশের সভাপতি মো. সেলিম, সম্পাদক লুৎফর রহমান এবং অন্য অংশে অরুণ কুমার গোস্বামী ও আব্দুল্লাহ আল মাসুদ দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৯-২০ সালে কাজী সাইফুদ্দিন সভাপতি এবং ড. সিদ্ধার্থ ভৌমিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ১৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার সময় তৎকালীন পরিবহন প্রশাসক সিদ্ধার্থ ভৌমিক ছাত্রলীগকে বাস সরবরাহ করেন, যাতে জবি ছাত্রলীগ ঢাবির টিএসসিতে হামলায় অংশ নেয়।
২০২০-২১ সালে একাংশের সভাপতি ছিলেন ড. আবুল হোসেন ও সম্পাদক কামাল হোসেন। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ এবং হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ উঠেছে আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে। কামাল হোসেন পরে শিক্ষক সমিতির সভাপতিও হন এবং ডিন থাকাকালে গুচ্ছে থাকা বা না থাকার বিতর্কে তৎকালীন উপাচার্যের সামনে এক শিক্ষককে চড় মারেন, যার বিচার এখনো হয়নি।
একই বছর অন্য অংশের সভাপতি ছিলেন ড. হাফিজুল ইসলাম ও সম্পাদক ড. মনিরুজ্জামান। পরিবহন দুর্নীতি ও অবৈধভাবে সহযোগী অধ্যাপক পদের বেতন নিয়ে তা ফেরত দিতে বাধ্য হন মনিরুজ্জামান। অনাস্থার কারণে বিভাগীয় চেয়ারম্যান পদ থেকেও সরে যেতে বাধ্য হন তিনি।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে একাংশের সভাপতি ছিলেন পরিমল বালা ও সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন। পরিমল বালা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সিন্ডিকেট সদস্য ও বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হয়েছিলেন। আনোয়ার হোসেন জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন। একই সময় অন্য কমিটিতে সভাপতি ছিলেন ড. আইনুল হক ও সম্পাদক লুৎফর রহমান। আইনুল হক জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে ছিলেন। তিনি ৩ আগস্ট হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। তৎকালীন এই ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অর্থনীতি সমিতির মাধ্যমে আবুল বারাকাতের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে জড়িত ছিলেন। সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের চাপে ডিন থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।
২০২২ সালের আগস্টে একাংশের সভাপতি ছিলেন ড. মো. জাকির হোসেন ও সম্পাদক ড. নাফিস আহমদ। ইউজিসি সদস্য জাকির হোসেনও ৩ আগস্ট হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান।
২০২৩ সালে একাংশের সভাপতি ছিলেন ড. নূরে আলম আব্দুল্লাহ ও সম্পাদক ড. মোমিন উদ্দিন। আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রশ্নফাঁসকারী শিক্ষককে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মোমিন উদ্দিন চব্বিশের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ম্যুরালে মোনাজাতে অংশ নেন। অন্য অংশের সভাপতি ড. ছিদ্দিকুর রহমান ও সম্পাদক মনিরুজ্জামান। জুলাই আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীরা ছিদ্দিকুরকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।
২০২৪ সালের কমিটিতে সভাপতি ছিলেন ড. জাকারিয়া মিয়া এবং সম্পাদক শাহ মো. আরিফুল আবেদ। আওয়ামী প্রভাবে বাংলা বিভাগে নিয়োগ পান আরিফুল। তিনি ৪ আগস্ট শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে জবিতে মানববন্ধনে নেতৃত্ব দেন।
অভিযোগের বিষয়ে আবদুল্লাহ-আল মাসুদ বলেন, সবাই মিলে তাকে সাধারণ সম্পাদক বানিয়েছিলেন। নিয়ম মেনেই অধ্যাপক হয়েছেন এবং ২৫ বছরের চাকরিতে যোগ্যতা ছাড়া কিছু নেননি। পরিবহন শাখায় অনিয়ম রোধে কাজ করলেও দায়িত্ব কঠিন হওয়ায় অব্যাহতি নেন।
আলী নূর বলেন, সংগঠনের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা নেই। গত চার বছর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রো-ভিসি ছিলেন। বর্তমানে সংগঠনটি সম্পর্কে কিছু জানেন না।
আলী আক্কাস বলেন, তিনি নিয়ম মেনেই সব দায়িত্ব পালন করেছেন। একাধিক ভাতা প্রশাসনিক পদের নয় বলে দাবি করলেও একাধিক পদে ভাতা নেওয়ার নিয়ম নেই বলে স্বীকার করেন। অবন্তিকার বিষয়ে বলেন, বিভাগে লিখিত অভিযোগ আসেনি, বিষয়টি যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির দায়িত্ব ছিল।
কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, উপাচার্য নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি, তিনি কারণ জানেন না। ২০১৬-১৭ সালে তিনি মীজানবিরোধী অংশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, মীজানের জমি কেনা ও নিগ্রহের প্রতিবাদে আন্দোলন করেছেন এবং কখনো কারো অনুগত না হয়ে শুধু রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত মেনেছেন বলে দাবি করেন।
এ বিষয়ে জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন আমার দেশকে বলেন, জুলাই গণহত্যায় যে-ই জড়িত থাকুক, তার বিচার হতে হবে। এখানে দলীয় পরিচয় বিবেচ্য নয়। জুলাই প্রশ্নে কোনো আপস নয়।
তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর গঠিত তদন্ত কমিটির শিক্ষকরা সহকর্মীদের বিরুদ্ধে যেতে না চাওয়ায় নতুন বিচার বিভাগীয় কমিশন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন।