বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারের জন্য আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিষয়ভিত্তিক কোর্সের পাশাপাশি তিনটি বিশেষ দক্ষতা উন্নয়নমূলক কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন।
বৃহস্পতিবার বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘Bridging Academia and Industry for Sustainable Development: Research Excellence, Innovation and Industrialization’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, বর্তমান সময়ে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করলেই একজন শিক্ষার্থীর চাকরির বাজারে সফল হওয়া নিশ্চিত নয়। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, চাকরির প্রস্তুতি, যোগাযোগ দক্ষতা, পেশাগত আচরণ ও নৈতিকতার মতো বিষয়েও শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্যেই আগামী জানুয়ারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ICT & AI (Information and Communication Technology and Artificial Intelligence)’, ‘Employability Skills’ এবং ‘Ethics and Professionalism’—এই তিনটি বিশেষ কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ‘Higher Education Acceleration & Transformation (HEAT)’ প্রকল্পের অধীনে কোর্সগুলো চালু করা হবে।
ইউজিসির এই সদস্য বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা খাতের আধুনিকায়নের পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ‘Industry-Academia Collaboration’ এবং ‘Internationalization of Education’-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা হলে তারা দেশীয় চাকরির বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও নিজেদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে পারবে। তৃতীয় ভাষায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে এবং বৈশ্বিক কর্মবাজারে বাংলাদেশের তরুণদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে।
তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে অধ্যাপক ড. মামুন বলেন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং শিল্পখাতের চাহিদার সমন্বয় ঘটানোই এসব উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি খাতে প্রতি বছর ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্টার্টআপ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ৫০০ কোটি টাকার ‘Startup Fund’ প্রস্তাব করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ধীরে ধীরে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ইউজিসির সদস্য বলেন, তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে তৈরি না করে চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘Innovation Hub’, ‘Incubation Centre’, ‘Startup Ecosystem’ এবং শিল্পখাতের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ‘UDYOG—Upazila-Driven Youth Opportunity for Growth’ কর্মসূচি চালু করেছে। এর মাধ্যমে উপজেলা পর্যায় থেকে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও বাজারসংযোগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
অধ্যাপক ড. মামুন বলেন, এ কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত তরুণ উদ্যোক্তারা তাঁদের ব্যবসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন পেতে পারেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো জামানত ছাড়াই এ অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও বাজারসংযোগেও সহায়তা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত করা নয়; তাদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারে, নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এবং অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের Institutional Quality Assurance Cell (IQAC) আয়োজিত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী।